তুলাইপাঞ্জি চালের ইতিহাস।

  রায়গঞ্জের #মোহিনীগঞ্জের_তুলাইপাঞ্জি-লেখায়ঃ বিশ্বজ্যোতি ভৌমিক(পাপন)

আপনি "মাছে ভাতে বাঙালি" বলুন বা "আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে", ভাত কিন্তু কমন।তাই সাধ করে বাঙালিকে ভেতো বাঙালিও বলা হয়। আজকের এই নবান্নের মরশুমে খাইবারপাস তাই আপনাদের সামনে হাজির করলো উত্তরদিনাজপুরের গর্ব তুলাইপাঞ্জি চাল।
      
|| #তুলাইপাঞ্জি_নামের_উৎপত্তি || 

  মিহিদানার মতো এই ধানে লম্বা লম্বা সাদা রঙের সুঙ থাকে, সেইজন্য দূর থেকে তাকে সাদা তুলোর মত দেখায় তাই অনেকে এই ধানকে তুলাইপাঞ্জি নামে ডাকে । কেউ কেউ বলে এই চালের ভাত পেঁজা তুলোর নরম ও সাদা ধবধবে, মুখে দিলেই মিলিয়ে যায় তাই এই চাল তুলাইপাঞ্জি নামে পরিচিত। কেউ কেউ একে তুলাইপাঞ্জা বা শুধু তুলাই ও বলে থাকে। প্রতি মঙ্গলবার রায়গঞ্জের মোহিনীগঞ্জের হাটে এই  চালের প্রচুর আমদানি হতো বলে এই চালের সাথে মোহিনীগঞ্জ নামটা যুক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমানে উন্নত মানের তুলাইপাঞ্জি চাল এই হাটে আসার আগেই বড় বড় পাইকাররা না নিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে, বাইরে এই চালের প্রচুর চাহিদা।     

তুলাইপাঞ্জি চালের ইতিহাস।


  
  ।। #তুলাইপাঞ্জি_চালের_চাষ ।।  

তুলাইপাঞ্জি চাল মুলত- 1নং ভাটোল, 2নং জগদীশপুর, 3নং মহীপুর, 4নং বিন্দোল, 6 নং রামপুর, 13নং কমলাবাড়ি অঞ্চলে বেশি চাষ হয়। বিশেষ করে জগদীশপুর অঞ্চলের রুনিয়া মোড় থেকে জাউনিয়া, হালালপুর, মসলন্দপুর ভাটোলের ভাটগঞ্জ পর্যন্ত এই অঞ্চলে অধিক পরিমাণে চাষ হয়। উত্তর দিনাজপুরের বাইরেও এখন তুলাই চালের চাষ হলেও তার স্বাদ ও গন্ধ কোনো মতেই রায়গঞ্জের তুলাইপাঞ্জি চালের ধারে কাছে নেই।                           

।। #তুলাইপাঞ্জি_চালের_সুখ্যাতি।

স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় এই চালের খ্যাতি শুধু আমাদের রাজ্যে কিংবা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই দেশের বাইরে বিদেশে ও এই চালের নামডাক আছে। দেশের বাইরে বাংলাদেশ ছাড়াও জার্মানি, ইংল্যান্ড চিনের সংহাই প্রদেশ, আমেরিকার ফ্লোরিডা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রভৃতি স্থানে পৌঁছে গেছে।FIFA ওয়ার্ল্ড কাপ থেকে অলিম্পিক প্রভৃতি বড় বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাতেও এই চাল পাঠানো হয়েছে। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই চালকে লন্ডন অলিম্পিকে ফুড ফেস্টিভ্যালে পাঠিয়েছিলো।  কলকাতা, ও তার পার্শ্ববর্তী জেলার কৃষিমেলা গুলিতে উত্তর দিনাজপুরের বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা তুলাইপাঞ্জি চাল প্যাকেট করে আসছে যার মাধ্যমে প্রচার ও হচ্ছে। রাজ্য সরকারের সুফল বাংলার স্টলেও এই চাল এখন পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু আসল নকল একটু দেখে নিতে হবে।

।।GI ট্যাগ প্রাপ্তি।

কোনো কিছুর GI(Geological Identification) তমকা পেলে সেই চালের খ্যাতি আরো বেড়ে যায়। তুলাইপাঞ্জি চালের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে 2005 সালে প্রথমবারের জন্য GI তকমা পেতে আবেদন করা হয়, শেষ পর্যন্ত অনেক আবেদন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর 2018 সালে W.T.O(World Trade Organization) পক্ষ থেকে তুলাইপাঞ্জি চালকে GI তকমা দেওয়া হয়। যার ফলে আমাদের উত্তর দিনাজপুর জেলা তথা রায়গঞ্জের গৌরব আরো বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।                              

।।#তুলাইপাঞ্জির_পরিচর্যা।।
  
চাষিরা  সাধারণত ভাদ্র অশ্বিন মাসের দিকে এর চারা রোপন করে অগ্রহায়ন মাসের দিকে কেটে ফেলে। জল ও সার খুব সামান্য লাগে এই ধান চাষে। এই ধানে বিশেষ এক যৌগ থাকার জন্য এই চাল এতো সুগন্ধি হয় যার চাষে সামান্য পরিমাণই জল ও সার লাগে।

।।তুলাইপাঞ্জি চালের দাম।।

৫ বছর আগে প্রায় তুলাইপাঞ্জি চালের দাম ছিল কেজি প্রতি ৫৫-৬০ টাকা।
২বছর আগে দাম ছিল কেজি প্রতি প্রায় ৭০-৮০ টাকা।
ছয়মাস আগে এই চালের দাম ছিল কেজি প্রতি প্রায় ১০০-১১০ টাকা।
বর্তমানে দাম কেজি প্রতি প্রায় ১১০-১২০ টাকা।

এই তুলাইপাঞ্জি চাল উত্তর দিনাজপুর বা রায়গঞ্জ এলাকার ঐতিহ্যমণ্ডিত। সিদ্ধ তুলাইপাঞ্জি দিয়ে ভাত ছাড়াও পোলাও, ফ্রায়েড রাইস তৈরি করা যায়। দুই ধরনের সিদ্ধ চাল হয়। নতুন চালে ভাত একটু নরম ও তার সেন্ট বেশি হয়। পুরনোটায় ভাত ঝরঝরে ও সেন্ট কম হয়। আতপে পায়েস ও খিচুড়ি ভালো হয়। চালটা মূলত মাঝারি সরু আকৃতির। ভাত সুস্বাদু, নরম ও সুগন্ধি হওয়ায় অনেকেই একে *বাংলার বাসমতী* বলছেন।

তাহলে শীতের আমেজে আপনারা পিকনিক করতে গেলে একবার ট্রাই করেই দেখুন তুলাইপাঞ্জি চালের ভাত বা ফ্রায়েডরাইস সাথে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা মাংস।কী জিভে জল চলে এল না! ঠিক এই জন্যই তো আমরা হাজির হই আপনাদের পাতে যাতে রসনার পরিতৃপ্তি করাতে পারি।


তুলাইপাঞ্জি চালের ইতিহাস

2 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন