ডেকার্স লেনের খাওয়ার ও ইতিহাস।

 

          কলকাতা শহরে খাবারের স্বর্গ রাজ্য-লেখায় অভ্রনীল রায়

'কলকাতা, কলকাতা, ডোন্ট ওয়রি কলকাতা, আমি তোমারই কলকাতা'- রাজধানী এ শহরের ওলিতে গলিতে ছড়িয়ে রয়েছে কত অজানারে! এশহরের ইট-কাঠ-পাথর গুলো হাতছানি দেয় ইতিহাসের। এমনই তো আর রাজধানী নয়, রাজা শব্দটা যখন এশহরের সাথে যুক্ত তখন বুঝতে হবে এর রাজকায়ী ব্যাপারস্যাপার ঠিক কতটা।

   ধরুন মফস্বলের কোনো গ্রাম বা শহরতলি থেকে এলেন ঘুরতে প্রানের এ শহরে।যাদুঘর থেকে ভিক্টোরিয়া,গড়ের মাঠ থেকে তারামন্ডল কিংবা গঙ্গার তীড়ে বা কালিঘাট মন্দির-সারাদিন টোটো করে থুরি মেট্রো বা লোকাল ট্রেন বা ট্রামে বাসে ঘুরে ক্লান্ত, দরকার পেটকে জামিন দেওয়ার কিন্তু পকেটে খুব একটা টাকা নেই,এখন কী করবেন? চিন্তা নেই বস্! আমরা 'খাইবারপাস' তো আছিই 'চিপ & বেস্ট' এর খাবারের হদিশ দিতে।আজ আমরা আপনাদের নিয়ে যাব ঠিক সেখানেই যা 'স্ট্রীট ফুড এর স্বর্গরাজ্য' বলে খ্যাত,যার নাম 'ডেকার্স লেন'-পকেট যেখানে বন্ধুর মত আচরন করে আর রসনা হয় তৃপ্তিদায়ক। তাহলে আর দেরী কিসের,চলুন ঢু মারি আজকের 'খাইবারপাস' এর বিশেষ সেগমেন্টে।

  

  ডেকার্স লেনকে নিঃসন্দেহে কলকাতার স্ট্রীট ফুডের 'স্বর্গরাজ্য' না বলেও 'স্বর্গ গলি' বললেও ভুল হবে না।এখানে বিক্রি হওয়া আলাদা আলাদা খাবারের মতো ডেকার্স লেনের আলাদা দুটো নাম রয়েছে। একটা *ডেকার্স লেন*, যে নামটার সঙ্গে বেশিরভাগ মানুষ পরিচিত। দ্বিতীয় নামটা হলো, *জেমস হিকি সরণি*

ডেকার্স লেনের খাওয়ার ও ইতিহাস।


    কলকাতায় ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে কলকাতার কালেক্টর *ফিলিপ মিলনার ডেকার্স* এই এলাকায় জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে দেখা করতেন। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটিয়ে আসা নাবিকরা ক্লান্ত হয়ে এখানে এসে বিভিন্ন রকমের খাবার খেয়ে পেট ভরাত। সেই থেকেই ক্রমে এই এলাকায় বিভিন্ন রকমের খাবার বিক্রি হতে শুরু হতে হয়। ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে, স্বাধীনতার পরে, বিভিন্ন অফিসের কর্মীদের নানা সময়ের নানারকম খাবার পরিবেশন করতে থাকে এই ছোট রাস্তা বা গলি।মাত্র ৭-১০ টি খাবারের দোকানে হাজারো পদের বাহারি খাবার অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে পরিবেশন করে চলেছে আজও একই ভাবে এই ডেকার্স লেন।


   আবার জেমস হিকি নামটা প্রায় সবাই ইতিহাসের বইতে পড়েছি আমরা। তাঁর দ্বারা প্রকাশিত 'বেঙ্গল গেজেট' সম্ভবত ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম সংবাদপত্র ছিল। তাঁর এই অবদানকে সম্মান জানিয়েই পরবর্তীতে এই রাস্তার নাম তাঁর নামেই করা হয়। যদিও বেশিরভাগ মানুষ এই রাস্তাকে আজও *ডেকার্স লেন* বলেই চেনে।


   সে নামে কী যায় আসে, ধর্মতলার মোড় থেকে ট্রামের আওয়াজ সঙ্গী করে এগোতে হবে রাজভবনের দিকে। মিনিট দুয়েক মৃদুমন্দ গতিতে হাঁটলেই ডান হাতে মিউনিসিপালিটির দেওয়া ফলকে লেখা জেমস হিকি সরণি, নীচে ডেকার্স লেন। ব্যাস একবার ঢুকলেই হল, ফিশফ্রাই,চিকেন,মটন,পোলাও,কোর্মা, স্যান্ডউইজ থেকে শুরু করে চা,ডিম টোস্ট,হালুয়া,চাউমিন,রোল,সরবত,মিষ্টি কী নেই সেখানে। সকাল সকাল শুরু হয়ে যায় দোকানের কর্মচারীদের ব্যস্ততা।দোকান বলতে কী! বেশীরভাগই পাকা নয়।গায়ে গায়ে লাগানো রাস্তার দুধারে 'খোলা রেস্টুরেন্ট'গুলো যেনো জানান দিচ্ছে হাম কিসে সে কম নেহি। কোনো দোকানে চলছে সকাল থেকেই পেঁয়াজ কাটা,কোথাও ময়দা মাখা,কোথাও বা তরকারি কাটার হিরিক। রোদ মাথায় ওঠার আগেই লুচির তরকারি, চায়ের দুধ ফোটানো, ডেভিলের পুর ভরা শেষ।একটু বেলা হতেই শুরু রমরমা।ডেকার্স লেন লেখা গলি দিয়ে ঢুকতেই ডানদিকে পরবে চাউমিন,রোল ও মোমোর দোকান।কম খরচে অথচ হাইজেন মেইনটেইন করে চলছে দেদার বিক্রি।  

 

ডেকার্স লেনের খাওয়ার ও ইতিহাস।

         চাউমিন,চিলিচিকেন,বাহারি মোমো,হরেক রকমের রোল সবই পাবেন সারাদিন। পাশেই নান পুরি,ঘুঘনি বা পুরি স্বব্জির দোকান।লম্বা কড়াই এর গরম তেলে শিল্পী তাঁর অসামান্য শিল্পকর্ম দেখিয়ে ভেজে তুলছে একেরপর এক গরম গরম 'ভালোবাসা'। অতি সামান্য টাকায় এত ভালো নান পুরি বোধহয় আর কোথাও পাওয়া যাবে না। তার পাশেই রয়েছে 'পাইস হোটেল',তবে কোনো ঝাঁ চকচকে স্টারসুলভ নয়,পুরনো আমলের কাঠের টেবিল সারি সারি পাতা,আর তাতেই অফিসবাবু থেকে সাধারণ মানুষ খেয়ে চলেছে ভাত,ডাল,মরশুমি স্বব্জি,নানা রকমের মাছ,মাংসের সম্ভার।এখানে না খেলে বোঝার উপায় নেই এত কম টাকায় কী ভাবে পেট ভড়ে খাবার খাওয়া যায়।এ বোধহয় ডেকার্স লেনেই সম্ভব। 

       

ডেকার্স লেনের খাওয়ার ও ইতিহাস।

        আবার রোজকার সাধারণ খাবার না খেয়ে স্বাদ বদলাতে চাইলেও পাবেন খোঁজ।গলি বরাবর সোজা এগিয়ে গেলেই অস্হায়ী এক দোকান,যেখানে বিশাল সাইজের ফিশ ফ্রাই থেকে শুরু করে পাবেন পোলাও,ফ্রায়েড রাইস,জিরা রাইস সাথে চিকেন বা মটন ভর্তা,পনির মশালা সহ আরো অনেক আইটেম।আর পেট ও মন ভরানো এই খাবারগুলো পাবেন কম্বো ভাবে যা মাত্র ৮০-১০০ টাকার মধ্যেই। কিন্তু এর স্বাদ যেকোনো এসি রেস্তোরাঁকে বলে বলে গোল দেবে। আবার এই কম্বো দোকানের উল্টোদিকে পাবেন স্যান্ডউইজ।৮-১০ রকমের এত উন্নত মানের অসাধারণ খেতে স্যান্ডউইজ হলফ করে বলা যেতে পারে গোটা কলকাতা শহরে আর কোথাও পাওয়া যায় না। এছাড়া, শেষ পাতে মিষ্টি মুখ করতে চাইলেও মিলবে ঠিকানা।এই গলিতেই আছে শ্যামমোহন শর্মার প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান।প্রায় ৫ বছর আগে উত্তরপ্রদেশ থেকে তাঁর বাবা কলকাতায় এসে এই দোকান শুরু করেন। মেদিনীপুরের কারিগরদের হাতে তৈরি হয় রসে টইটম্বুর নরম তুলতুলে গুলাবজামুন, দুধসাদা রাবড়ি, পেঁপের হালুয়া, ক্ষীরের শিঙাড়া আর শীতে গাজরের হালুয়া। লস্যির উপরে থাকে মোটা মালাইয়ের প্রলেপ। গরম দুধও বিক্রি হয়।অথেন্টিক গাজরের হালুয়ার স্বাদ আপনাকে পাগল করে দিতে পারে এবিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। 

ডেকার্স লেনের খাওয়ার ও ইতিহাস।


ডেকার্স লেনের নস্টালজিয়া চিত্তদার দোকান:

পাশেই জনপ্রিয় ও সকলের পরিচিত চিত্তদার দোকান। প্রায় সত্তর বছর আগে পূর্ববঙ্গ থেকে বড় ছেলে চিত্তরঞ্জন রায়ের হাত ধরে কলকাতায় আসেন শিরীষচন্দ্র রায়। প্রথমে দোকান খোলেন টি-বোর্ডের কাছে পুরনো পাসপোর্ট অফিসের সামনে। পরে তা সরিয়ে আনেন এই গলিতে। এ দোকানের ফিশ ফ্রাই, ডিমের ডেভিল, চিকেন স্টু কলকাতার খাদ্যপ্রেমীদের রসনা-মানচিত্রে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে কর্মচারীদের জেড গতির সার্ভিস আর উষ্ণ আন্তরিকতা। এখানকার বিখ্যাত খাবার অবশ্যই নরম গরম টোস্ট সাথে চিকেন স্টু।এরকম স্টু খেতেই বোধহয় শুধু মাত্র কলকাতা শহরে আসা যেতে পারে। এতটাই এর টেস্ট ও আন্তরিকতা।

এখানে এক ডাক্তারের বাড়িতে আগে আসর বসত গানের। মান্না দে আসতেন। ফ্রাই, কাটলেট... অনেক খাবার যেত এখান থেকে। এখনও মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে এখান থেকে চিকেন স্টু ও অন্যান্য খাবার যায়।

গলির ভিতরে ঢুকলে রয়েছে এঁদেরই একটি অংশ 'সুরুচি হোটেল'।। এখানে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।পাওয়া যায় দুটো দোকানে একই আইটেম।এই চিত্ত দার দোকানের স্টু সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও খেতেন। অনেক খেলোয়াড়ই তখন আসতেন। আসলে ময়দান থেকে এখানে ঝট করে আসা যেত। আর খেলোয়াড়দের জন্যই এঁর স্টু-ও এমন ভাবে তৈরি, যাতে তাঁরা এনার্জি পান। প্রোটিনের জন্য চিকেনের টুকরো সঙ্গে পেঁপে, গাজর ও বিনস। আলু থাকে না। পুরোটাই তৈরি হয় মাখনে। এছাড়া রোজকার কড়া চা,ডিমের ডেভিল,বাটার টোস্ট এসবও চিত্তদার দোকানের সেরা খাবার।

ডেকার্স লেনের খাওয়ার ও ইতিহাস।


   তাহলে,আর দেরী কিসের।শীতের আমেজকে সঙ্গী করে,ভালেবাসার মানুষকে নিয়ে একবার ঢু মেরেই আসুন এই স্বর্গরাজ্যে।পকেট যেখানে ভরসা দেয় সেটাই তো আসল 'খাইবারপাস'। নিজেরাই বরং একবার চাক্ষুস করুন এ গলি এবং চেখে দেখুন এর সৃষ্টিকে। আর আনন্দে গেয়ে উঠুন- 


'শহরের রানী গো,আমরা তোমায় জানি গো,তুমি যে নয়া রূপকথা'!


2 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন