'পাইস হোটেল' কী এবং এর নামকরনের ইতিহাসঃ লেখায়~ অভ্রনীল রায়।

 


'কোলকাতা,তুমিও হেঁটে দেখো কোলকাতা'- অনুপম রায়ের এই গানই বলে দিচ্ছে তিলোত্তমা এ শহরে হেটে দেখার মত বিষয়ের কোনো অভাব নেই।সে ব্যোমকেশ বক্সির বাড়িই হোক বা প্রিন্সেপ ঘাট- রাজধানী শহরের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য জানা-অজানার মিশেল। তবে আমরা 'খাইবারপাস' তো আর দর্শনীয় স্হান নিয়ে মাথা ঘামাই না,আমরা বরং বলি ঘুরে ফিরে ক্লান্ত হলে তার উপায়ের কথা।হ্যাঁ,জানেনই তো খাবার দাবারের হদিশ দেওয়াই আমাদের কাজ। আর আজ তেমনই এই কলকাতার বুকে রসনার পরিতৃপ্তি করার জন্য এক বিশেষ ধরনের খাবার হোটেলের কথা বলব,যা কলকাতার বাইরে কিন্তু পাবেন না।তাহলে আর ভনিতা না করে চলুন 'খাওয়া শুরু করি'!

আজ আমরা বলতে এসেছি 'পাইস হোটেল'-এর কথা।ভাবছেন এ আবার কি!!! মানে হোটেল তো সর্বত্রই আছে তাতে আর নতুন কি???? কিন্তু আজ তো সাধারণ বা অতি উচ্চ মানের কোনো হোটেল নিয়ে বলবো না,আজ বলবো 'পাইস হোটেল' এর ইতিহাস।হয়তো অনেকেই নাম শুনেছেন,পুরনো সিনেমা বা সাহিত্যে অনেকবারই উল্লেখ পাওয়া যায় পাইস হোটেল এর।আর যারা জানেন না তাদের জন্য তো রইলামই আমরা।শুধু জেনে নিন,তারপর কলকাতার পাইস হোটেল গুলোতে ঢু মারাটা কিন্তু সময়ের অপেক্ষা।

কলকাতার খাবারের ইতিহাসের মাধ্যমে যদি আমরা কিছু দশক আগে ফিরে যাই, দেখতে পাব শহরের বুকে রমরমা রাজ পাইস হোটেলের। পাইস হোটেল নামটি আমরা শুনে থাকলেও হয়তো আমরা অনেকেই জানি না যে কেন এইরকম নামকরণ। মনে করা হয়, এক সময় এখানে খাবার পাওয়া যেত চার আনা বা এক পাইস মুদ্রার পরিবর্তে। আবার অনেক সময় বলা হয়, এই সমস্ত হোটেলগুলিতে প্রতিটি আইটেমের দাম আলাদা করে গণনা করা হয়, লেবু নুন সমেত। পিস বাই পিস দাম নেওয়া হয় বলেও ধারণা যে এইসমস্ত হোটেলের নাম পাইস হোটেল।


'পাইস হোটেল' কী এবং এর নামকরনের ইতিহাস।

অনেক ধারনার মধ্যেও যেটা আদতে সত্যি বলে মনে করা হয় তা হল-পাইস কথাটি খুব সম্ভবত এসেছে পয়সা থেকেই। এক আনার চার ভাগের একভাগই হল পাইস।

এই নামের মধ্যে আছে এক প্রাচীন ইতিহাস। বহু যুগ আগে,যখন কলকাতার মত শহরে ঘরোয়া পরিবেশে ১ পাইস বা ২ পাইস দিয়ে মাটিতে বসে আসন পেতে বাঙালিরা ভোজন সারতেন সেই সব হোটেলে যখন কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী।

সেই সময় থেকেই একটু একটু করে বাঙালি সমাজেও ঢুকে পড়েছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার আলো। ইংরেজদের সাথেই অফিস বা ব্যবসার কাজ করতে হত বাঙালিদের । সেই সূত্রে কাজের সন্ধানে কিছু মানুষ কলকাতায় এসে জড়ো হয়েছিল যাদের আদি বাস ছিল  গ্রামে। সেই সব বাঙালী বাবুরা সরকারি কাজে যোগ দিলেও তাদের মাইনে ছিল অনেকটাই কম। এত অল্প মাইনে হলেও দরকার ছিল মাথা গোজার স্হান আর অল্প কিছু খাবারের ব্যবস্থা করা। বাঙালিদের একঘেয়ে রোজ রোজ একই মেসের খাবার ভালো লাগতো না তাই অল্প টাকা খরচ করে মনের স্বাদ মেটাতে সেই সময় তৈরি হয়েছিল 'পাইস হোটেল'। যেখানে অল্প পয়সায় পাওয়া যেত ঠিক যেন মায়ের হাতে তৈরি করা মনের মত ঘরোয়া খাবার।

ঘরোয়া স্বাদের খাবার, পাত পেড়ে একসাথে খাবার খাওয়া, আর সাথে সকল শ্রেণির মানুষের আনাগোনাই পাইস হোটেলের বৈশিষ্ট্য। আজও পকেটে ১০০ টাকা হাতে থাকলেই পেট পুরে খেয়ে আসা যাবে শহরের নামকরা পাইস হোটেলগুলিতে।

আর এই পাইস হোটেল গুলোতে সব আইটেমই আপনাকে আলাদা করে কিনতে হবে।এমনকী থালা,বাটি,গ্লাসেরও দাম ধরা হয়।মোদ্দা কথা আপনার যা খেতে মন চাইবে সেটাই অর্ডার করে খাবেন যার যা রুচি সেই অনুযায়ী।অন্যান্য হোটেলগুলোর মত কোনো 'মিল' অনুযায়ী দামের ব্যাপার নেই।


'পাইস হোটেল' কী এবং এর নামকরনের ইতিহাস


আর অবশ্যই পাইস হোটেল মানেই টাটকা খাবার।এই হোটেলগুলোতে কোনো খাবারই বাসি হয় না,যার সব চেয়ে বড় উদাহরণ মাছ।এই হোটেলগুলোতে রোজ বহু রকমের মাছের আইটেম হয় যা দেখলে অবাক হতে বাধ্য।আর সেই সংগে খাবারের দাম সেদিনের বাজারে মূল্যের উপর নির্ধারিত হয়,অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট দাম থাকে না।

এবার,আমরা কলকাতার পাঁচটি বিখ্যাত 'পাইস হোটেলের' নাম ও তার ঠিকানা দেব।(কোনো বিজ্ঞাপনিক উদ্দেশ্যে নয়)। চাইলে একবার গিয়ে খেয়ে আমাদের অবশ্যই জানাবেন।তাহলেই 'খাইবারপাস' এর এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য সফল হবে।

কলকাতার বিখ্যাত কয়েকটি পাইস হোটেল-

১. তরুণ নিকেতন হোটেলঃ

লেক মার্কেট চত্বরের পাইস হোটেল কালচারের ধারক ও বাহক হল ১৯১৫ সালে স্থাপিত তরুণ নিকেতন হোটেল। ঈশান চন্দ্র দেবের হাত ধরে এই খাবার দোকানের সূত্রপাত। এখানে গেলে অবশ্যই খাবেন হাঁসের ডিমের কাড়ি, ও মটনের পাতলা ঝোল।

২. সিদ্ধেশ্বরী হোটেলঃ

ধর্মতলার জানবাজার অঞ্চলে, রাণী রাসমণির আদি গৃহের হাঁটা দূরত্বে এই পাইস হোটেলটি স্থাপিত হয়েছিল ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে, জনৈক ক্ষুদিরাম সরকারের হাত ধরে। এখানে গেলে খেতে ভুলবেন না কবিরাজি ঝোল,ঝুরি আলুভাজা।

৩. স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল

মানগোবিন্দ পাণ্ডার হাত ধরে এই পাইস হোটেলটির পথ চলা ১৯২৭ সালে। প্রেসিডেন্সি কলেজের পিছনের গলিতে সগর্বে কাটিয়ে দিয়েছে প্রায় ১০০ বছর। কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে হওয়ার সুবাদে, ছাত্র, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, খাদ্যরসিক, বইপ্রেমিক, প্রায় সব ধরণের মানুষেরই এখানে অবাধ বিচরণ। এখানকার প্রসিদ্ধ খাবারের মধ্যে ছোটো ছোটো আলু দিয়ে পার্সের ঝাল,তিনকাটা মাছের চচ্চড়ি,এবং অবশ্যই চিতল মাছের মুইঠ্যার বড়া।

'পাইস হোটেল' কী এবং এর নামকরনের ইতিহাস

৪. জগন্মাতা ভোজনালয়ঃ

৪০ কৈলাশ স্ট্রীটের ঠিকানায় পৌঁছলেই পাবেন ১২০ বছর পুরনো এই পাইস হোটেলের খোঁজ। উত্তর কলকাতায় অদ্যিকালের এক বাড়িতে বিবেকানন্দ রোডের কাছে এই পাইস হোটেলটি আজও স্বমহিমায় বিরাজমান। উল্লেখ্য, অন্যান্য পাইস হোটেলে বন্ধ হয়ে গেলেও এখানে এখনও গেলে পাবেন মাটিতে আসনের উপর বসে পাত পেড়ে খাওয়ার রেওয়াজ, এবং কলাপাতার থালায় ও মাটির গ্লাসে খাবার পরিবেশনের আমেজ। এখানকার প্রচলিত সেরা খাবারের মধ্যে পমফ্রেট মাছের ঝাল,মাছের ডিমের বড়ার ঝোল বিখ্যাত।

৫. আদর্শ হিন্দু হোটেলঃ

গরিয়াহাটের কাছে, ২১২ রাসবিহারী এভিনিউ-এর উপরে রয়েছে এই পাইস হোটেলটি। বিভূতিভূষণের রচিত বিখ্যাত উপন্যাসের নামে নামাঙ্কিত এই দোকান। দক্ষিণ কলকাতায় বসে উত্তর কলকাতার আমেজ যে কয়টি হাতে গোনা জায়গায় পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে এই পাইস হোটেলটির উজ্জ্বল নিদর্শন। এখানে যে যে বিভিন্ন মাছের আইটেম ট্রাই করে দেখতে পারেন তার মধ্যে অন্যতম ট্যাংরার ঝাল,চিতলের পেটি,পাতলা করে বড়ি দিয়ে রুই মাছ।

কেমন লাগল 'পাইস হোটেল' ও তার ইতিহাস তা জানাতে ভুলবেন না কমেন্ট বক্সে।এছাড়াও আপনার মন্তব্য জানান মেইল করেঃ khaibarpass2021@gmail.com এ বা হোয়াটসঅ্যাপ করেও।নম্বরঃ 8967556639.

2 মন্তব্যসমূহ

  1. Adorsho hindu hotel .....jeta bibhuti Bhushan er uponnashe pai.....ekhono exist kore ....ranaghat 1 number station er baire

    উত্তরমুছুন
  2. অনেকদিন বাদে ভালো লেখা পড়লাম, কন্টিনিউ হোক 😊

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন