চড়ামচড়াম 'গুড়-বাতাসা' ও 'নকুলদানায়' আজ কেষ্ট পূজা- লেখায়~অভ্রনীল রায়।

 

আজ রাখির দিন।বাঙালির এক শ্রেষ্ঠ উৎসব।হাতে রাখি পরিয়ে সৌহার্দ্য স্হাপন করলেও আমরা সম্পর্কগুলোকে আদতে 'মনে রাখি'। কিন্তু সকালের দিকে একবার টিভি খুলতেই চোখ আটকে গেলো ব্রেকিং নিউজে।সিবিআই এর হাতে গ্রেপ্তার দোর্দন্ডপ্রতাপ নেতা কেষ্ট মন্ডল! 

ব্যাস! রাখি কে মনে রেখেই হামলে পড়লাম একটার পর একটা টিভি চ্যানেলে।এরকম রাজনৈতিক এক্সক্লুসিভ খবর যেনো বাঙালির রাখি উৎসবকে এক দিকে ঠেলে দিল। কিন্তু মুশকিল হ'ল অন্য জায়গায়! আমাদের খাইবারপাস তো না রাখির গল্প, না কেষ্টর গল্প কোনোটাই দিতে চায় না।আমরা চাই 'খাবারের কথা' জানাতে।কোথায় রাখির দিন একটু বাঙালি পাঠককে মিষ্টি মুখ করাবো তা না!!! তাহলে কী হবে!
এরকমই একরকম ভাবনা চিন্তা করতে করতেই জনৈক এক ব্যক্তির ট্যুইটে চোখ আটকে গেলো।তিনি লিখেছেন-

পড়ল এবার ঢাকে কাঠি
চরাম-চরাম আওয়াজ
গুড় বাতাসা, নকুলদানায়
কেষ্ট পুজোর রেওয়াজ।

ব্যাস! কেল্লাফতে। এক ঢিলে দুই পাখি মারার সুযোগ পেয়ে আমিও বেশ আহ্লাদিত হয়ে পড়লাম।আর আপনাদের সামনে হাজির করলাম আজকের জন্য তরতর করে 'দাম' বেড়ে যাওয়া দুটি মিষ্টি 'গুড় বাতাসা' ও 'নকুলদানা'র ইতিহাস নিয়ে।কি আজ তবে উপভোগ করুন এই দুই মিষ্টিতেই.......

চড়ামচড়াম 'গুড়-বাতাসা' ও 'নকুলদানায়' আজ কেষ্ট পূজা


বাতাসা মূলত বাংলাদেশে তৈরি একটি জনপ্রিয় মিষ্টি।যা বাঙালি দীর্ঘদিন ধরে ঠাকুর পূজায় প্রসাদ হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে।৩-৪ সেন্টিমিটার আয়তনের গোল এই মিষ্টি প্রাচীন সময়ে বাঙালি অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহার করতো।আমরা অনেকেই সাহিত্য বা সিনেমায় এ দৃশ্য দেখেছি যেখানে বড় পিতলের থালায় কয়েকটি বাতাসা এবং এক গ্লাস ঠান্ডা জল দিয়ে অতিথি সৎকার করা হত।আবার বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করতে ছেলের বাড়ি থেকে বাতাসা নিয়ে যাওয়া হত কারন বাতাসাকে শুভ কাজের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করত মানুষ।যার উল্লেখ আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা 'শুভদৃষ্টি' গল্পে পাই যেখানে দেখা যায় পিতলের বড় রেকাবি করে বাতাসা নিয়ে হাজির হয় বরপক্ষ।

বাতাসা মূলত দুরকমের।চিনি দিয়ে তৈরি যা 'সাদা বাতাসা' এবং গুড় দিয়ে তৈরি 'গুড় বাতাসা'। তা ছাড়া ইদানীং বিভিন্ন রকম রাসায়নিক রং মিশিয়ে লাল, সবুজ, হলুদ বাতাসা তৈরি করা হচ্ছে। তবে তা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।
তবে সাদা এবং গুড় বাতাসা দুটো তৈরির কৌশলই একই রকম। আসুন কিভাবে এই মিষ্টি তৈরি হয় তা একটু জেনে নিই-

চড়ামচড়াম 'গুড়-বাতাসা' ও 'নকুলদানায়' আজ কেষ্ট পূজা


জল, গুড় ও চিনির সঠিক সংমিশ্রণে বাতাসা তৈরি হয়। মূলত বিশাল সাইজের অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে দেড়-দুই কেজি চিনি, দুশো গ্রাম ভেলিগুড় ও এক লিটার জলের সংমিশ্রণে গনগনে আঁচে তা ফোটাতে হবে। এরপর গাঢ় রসে পূর্ণ হাঁড়িটি আঁচ থেকে নামিয়ে ফেলতে হবে। তারপর কাঠ বা বাঁশের তাড়ু (যা খুন্তি জাতীয় বাসন) দিয়ে ভালোভাবে নাড়াচাড়া করলে বীজ বা গেঁজালো রস তৈরি হয়। এরপর হাঁড়িটিকে সাঁড়াশি জাতীয় যন্ত্রের সাহায্যে ধরে শীতল পাটির চাটাইের উপর রসের ছোট ছোট ফোটা ফেলা হয়। রসালো ফোটা গুলিই হাওয়ার সংস্পর্শে ঠান্ডা হয়ে বাতাসার রূপ নেয়। এটা গেল 'গুড় বাতসা' তৈরির প্রক্রিয়া

একই রকম ভাবে শুধু চিনি এবং তাঁর সঙ্গে পরিমাপ মতো রাসায়নিক দ্রব্য, রেডির তেল, রিটে ফলের রস দিয়ে সাদা বাতাসা বা চিনির বতাসা তৈরি হয়।

চড়ামচড়াম 'গুড়-বাতাসা' ও 'নকুলদানায়' আজ কেষ্ট পূজা


তবে দুইধরনের বাতাসার মধ্যে বেশী উপকারী কিন্তু অবশ্যই 'গুড় বাতাসা'। কারন আমরা জানি অতিরিক্ত চিনি শরীরে অনেক রকম রোগের সৃষ্টি করে,তবে গুড়ের ক্ষেত্রে সে সমস্যা হয় না।বরং কাশি, ঠান্ডা লেগে নাক দিয়ে জল পড়া, মাইগ্রেন, পেট ফাঁপার মতো রোগে উপকারি গুড়। হালকা গরম জলে কয়েকটি গুড়বাতাসা মিশিয়ে সেই জল খেলে উপকার। প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম কমায় গুড়বাতাসা।

এবার আসি নকুলদানার কথায়। নকুলদানাও একপ্রকারের চিনির তৈরি মিষ্টি । এটা ছোট ছোট বলের মত দেখতে হয়,মাঝে অনেক খাঁজকাটা থাকে । সাধারণত বাঙালি পূজায় বাতাসার মতই এটিকে প্রসাদ হিসেবে ব্যবহার করে। কবে থেকে নকুলদানায় জন্ম তা সঠিক জানা না গেলেও মনে করা হয় মহাভারতে এর উল্লেখ আছে।তাহলে একটু জেনে নেওয়ার দরকার অবশ্যই আছে এরকম নামকরনের পেছনে কারন কী!

মনে করা হয়, পঞ্চপান্ডবের চতুর্থ পান্ডব নকুল খাবার দাবার নিয়ে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালোবাসতেন। তিনি খই কে চিনির রসে ডুবিয়ে দেখতে গেছিলেন কেমন হয় খেতে। তো খেতে তো ভালো লাগলোই, তার সঙ্গে এটা দেখতেও বেশ আকর্ষক মনে হলো। তাই এই মিষ্টির নাম নকুলের নামেই রাখতে পরামর্শ দিলেন তাঁর সঙ্গী সাথীরা। তখন থেকেই এই মিষ্টি চলে আসছে খাদ্যরসিক নকুলের নাম বহন করে।

নকুলদানা আগেও থাকলেও এই ধবধবে চিনির লজেন্সের গুলি, ইংরেজরা চিনির কল বসানোর পরেই হয়েছে বলে জানা যায়। গত শতকেও গান গেয়ে ঘুঙুর পরে নকুলদানা বিক্রি করতেন শহুরে থাকা ফেরিওয়ালারা,তবে আজ এ দৃশ্য দেখা যায় না। বাস্তবিক, চিনির মণ্ড হিসেবে নকুলদানাকে চিনলেও ছোলা-বাদামযোগে দানা পাকিয়ে নকুলদানাও এক সময়ে সহজলভ্য ছিল।নকুল মানে ছোট! আবার মুখরোচক খাদ্যবস্তুও। ভারতচন্দ্রেও কিন্তু নকুলদানার উল্লেখ রয়েছে।

নকুলদানা হ'ল পরম বৈষ্ণব মিষ্টি। বৈষ্ণব পদাবলী, চৈতন্য চরিতামৃত থেকে রাধিকার শতনাম গীতাঞ্জলির নানা আচারে কাঁসার বাটিতে নকুলদানা নিবেদনের খুঁটিনাটি রয়েছে। ওড়িশার শ্রীপটের রাধাকৃষ্ণ থেকে মল্লিকদের গৃহদেবতার নিত্যসেবায় অতিআবশ্যিক তার উপস্থিতি। জগন্নাথের নিদ্রাভঙ্গে বাল্যভোগে মাখন-মিছরিযোগে নকুলদানা,বা তারপরে জলপানি ভোগে রুপোর পাত্রে পান-সুপুরি-ছোলা-আদা-মিছরির সঙ্গী নকুলদানা কিংবা বৈকালিক ভোগেও হরির লুঠের বাতাসার সহচর সেই নকুলদানাই।

আসুন এবার একটু জেনে নিই কীভাবে নকুলদানা তৈরি হয়-

চিনির মধ্যে জল দিয়ে তাতে সোডা মিশিয়ে সিরা তৈরি করা হয়। সেই সিরার মধ্যে একটা খৈ বা মটর দানা ডুবালে, সেই খৈ বা মটর দানার মধ্যে চিনির সিরা লেগে ডুমো আকারের যা তৈরি হয় তাই নকুলদানা।

চড়ামচড়াম 'গুড়-বাতাসা' ও 'নকুলদানায়' আজ কেষ্ট পূজা


বাংলার ঘরে ঘরে বাতাসা-নকুলদানা বেশ জনপ্রিয় হলেও এই শিল্প কিন্তু এখন বেশ সমস্যায়।বর্ধমানের নীলপুর,বালুরঘাটের তপন,মালদার হরিশ্চন্দ্রপুর বা কলকাতা পার্শ্ববর্তী বেলেঘাটায় নকুলদানা-বাতাসার অনেক কারখানা থাকলেও বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধিতে এই শিল্পকে সঠিক কর্মী ও ভালোমানের যন্ত্রপাতির অভাবে বাজারজাত করা যাচ্ছে না।বাংলা সহ দক্ষিনভারতেও নকুলদানার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে,সর্বত্র এত চাহিদাতেও সরকারি সুবিধার অভাবে 'সস্তার মিষ্টি' কিন্তু আজ শুধু মাত্র রাজনৈতিক কারনে 'খবরে' থাকলেও আসল খবর কিন্তু মোটেও সুবিধার নয়। তাই আমরা খাইবারপাস থেকে চাই সকলে বেশী করে 'গুড় বাতাসা ও নকুলদানা' খান এবং 'কেষ্ট পূজায়' নয় শুধু সব পার্বনেই মেতে উঠুন।

(এই আর্টিকেল কেমন লাগল তা অবশ্যই জানান কমেন্ট করে।আর কী কী বিষয়ে লেখা চান তাও জানাতে পারেন। এছাড়া মেইল করেও জানাতে পারেন আপনার মূল্যবান মতামত।মেইল আইডি khaibarpass2021@gmail.com  বা করুন হোয়াটসঅ্যাপ এই নম্বরে- 8967556639)

1 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন