রসকদম্ব ও কানসাট মিষ্টির ইতিহাস।লেখায়- মনোসিজ কর।

 সময় টা যদিও মিষ্টি নয়, তবুও মিষ্টি খেতে তো আপত্তি নেই।আজ আপনাদের কাছে নিয়ে এসেছি আমাদের পার্শ্ববর্তী জেলা মালদার দুটো বিখ্যাত মিষ্টি।


আচ্ছা বলুন তো মালদা বলতে আপনার প্রথম কোন জিনিসটা মাথায় আসে? আচ্ছা,আমি কিছু টা গেস করে দিচ্ছি।আপনি হয়তো মালদা বলতে ভাবতে শুরু করবেন গৌড় বা ফজলি আমার কথা ।কিন্তু না,আজ মালদার দুটো মিষ্টির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করার জন্য এই প্রতিবেদন।


প্রথমে আসি "রসকদম্বের" কথায়। আপনারা অনেকেই জানেন এই মিষ্টির কথা।মালদা, মুর্শিদাবাদ থেকে শুরু করে সমগ্র উত্তরবঙ্গ এমনকি বর্তমানে দক্ষিণ বঙ্গেও এর খ্যাতি ও ব্যাপ্তি সমান ভাবে ছড়িয়ে পরেছে।বছর কয়েক আগে যখন রসগোল্লার GI ট্যাগ নিয়ে বাঙালি পার্শ্ববর্তী রাজ্য ওড়িশার সাথে "ট্যাগ" ওফ ওয়ার এ মেট উঠেছিল তখন ই গৌড় বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় এর গবেষক রাও রসগোল্লার পাশাপাশি " রসকদম্ব " কেও এই ট্যাগ এর আওতায় আনতে চেয়েছিলেন । রসগোল্লার মত এর কিন্তু অন্য কোনো দাবীদার নেই,এই মিষ্টি আদ্যন্ত বাঙালি।

রসকদম্ব ও কানসাট মিষ্টির ইতিহাস

প্রায় ৭০০ বছর ধরে এই মিষ্টি বাংলা ও বাঙালির রসনাতৃপ্তি করে আসছে আমাদের পার্শ্ববর্তী জেলা মালদার প্রতিটা মিষ্টির দোকানেই প্রধান মিষ্টি বলতে যে মিষ্টি টা সবার আগে বেরিয়ে আসে সেটা রসকদম্ব।


ফজলি আম, গৌড় এর ধ্বংসাবশেষ এর সাথে সাথে মালদার মুকুটের অন্যতম পালক এই রসকদম্ব।


শোনা যায় হুসেন শাহ এর আমলে ১৫৩০ সালের আসে পাশে শ্রী চৈতন্য দেব গৌড় সংলগ্ন রামকেলি তে আসেন প্রেম এর বাণী নিয়ে সেখানে অবস্থান কালে তিনদিন তিনি ছিলেন এক কেলি কদম্ব গাছের নীচে।সেখানেই তাকে অ্যাপায়ানের জন্য কদম ফুলের আকারের এই মিষ্টি তৈরি করা হয়,সেখানেই তিনি দীক্ষা দিয়েছিলেন রূপ ও সনাতন কে।যদিও ঐতিহাসিক র এই মতামতের সত্যতা স্বীকার করেন না। 


প্রস্তুত প্রণালী থেকে বোঝা যায় এই মিষ্টি ফ্রীজ এ না রাখলেও প্রায় ৫-৬ দিন অনায়াসে ভালো থাকে। রসোকদম্ব এর জন্য বিশেষ আকারের ছোট রসগোল্লা তৈরি করেন কারিগরেরা।এর পর এই ছোট আকারের রসগোল্লা কে খাঁটি দুধের ক্ষির থেকে তৈরি এক গোলকের পুর হিসেবে ব্যবহার করা হয়, ও ক্ষীর এর গোলকের বাইরের দিক টায় পষ্টর দানা দিয়ে কদম ফুলের আকার দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।এইভাবেই তৈরি হয় রসকদম্ব।এই মিষ্টি মুখে দিলে প্রথমে বোঝ যায় বাইরের পোস্তর দানা ও ক্ষীরের শক্ত আবরণ তারপর আসে সেই আবরণ ভেদ করে ভেতরের নরম রসগোল্লার স্বাদ।যেহেতু প্রায় ৫-৬ দিন এই মিষ্টি খারাপ হয় না তাই অনায়াসে কোথাও নিয়ে যাওয়ার জন্য এই মিষ্টি আদর্শ।


এবার আসি মালদার আর এক একান্ত আপন "কানসাট"এর কথায়। এই মিষ্টি আসলে চমচমের জাতভাই,তবে ক্ষীরের পরিমাণ অন্যান্য চমচমের থেকে বেশি। ক্ষীর ও খোয়া দিয়ে তৈরি হয় এই মিষ্টি।ক্ষীরের জাল ঠিক কতটা হবে তার ওপরেই নির্ভর করে এই মিষ্টির স্বাদ । ঠিক ঠাক ক্ষীরের জাল হয়ে গেলে ওপরে ভাজা খোয়া ছড়িয়ে চমচমের আকারে বানিয়ে নেওয়া হয় এই মিষ্টি, যার খ্যাতি মালদা থেকে ভারতের প্রাক্তন  প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবন অব্দি পৌঁছে গেছিলো।


মালদার মকদমপুরে দেশভাগের পর এসে ওঠেন ওপার বাংলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর "কানসাট"। এলাকার প্রসিদ্ধ মিষ্টি ব্যবসায়ী মহেন্দ্রনাথ সহর পরিবার সাথে করে নিয়ে আসেন নিজের পূর্বপুরুষের ভিটের নাম জড়ানো মিষ্টি " কানসাট" ,।কানসাট চমচম এর মতই রসের মিষ্টি।এই মিষ্টিতে ভাজা খোয়ার প্রলেপ একে অন্য মাত্রা দিয়েছে।বর্তমানে কানসাট নামে একটা আস্ত দোকান চালান মহেন্দ্রনাথ সাহার উত্তর সুরি বিশ্বজিৎ সাহা ও জয়দেব সাহা।কানসাট দোকানের অন্যান্য মিষ্টিকে প্রায় দশ গোল দেয় এদের এই বিশেষ মিষ্টি।

রসকদম্ব ও কানসাট মিষ্টির ইতিহাস



বর্তমানে মালদার প্রায় প্রতিটা দোকানের শোকেস এ দেখতে পাবেন জেলার রসনা তৃপ্তির অন্যতম এই দুই উপাদান কে,আত্র কি চেখে দেখুন ,আমাদের জানান কেমন লাগলো কানসাট র রসকদম্ব।

3 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন