মনোহরার ইতিহাস। লেখায়- অভ্রনীল রায়।

             ।এক মন হরণ করা মিষ্টির গল্প।


"শহর জু্ড়ে যেনো প্রেমেরই মরশুম''- আজ তো ভালোবাসার দিন।আর আজকের দিনে আকাশে-বাতাসে যেন প্রেমের ভাব।আর ফেব্রুয়ারীর শুরু মানেই তো লাল গোলাপের খোঁজ,দেশী-বিদেশী চকোলেট,হার্ট শেপের বেলুন বা প্রেমিকার পছন্দের টেডি-মদ্দা কথা ভালোবাসার মানুষটার মন পেতে এসব উপহারই সম্বল প্রেমীকদের।এ তো হয়েই আসছে জন্ম জন্মান্তর জুড়ে।এখন ভালোবাসা মানেই সেলিব্রেশন এতে তো আর অবাক হবার কিছু নেই।কিন্তু এসব চেনা পরিচিত গিফট্ এর বাইরে এমন কিছু কি আপনার প্রিয় সঙ্গিনীকে দিতে পারেন না যাতে করে তার 'মন' টাকে আরো একবার 'হরণ' করা যেতে পারে! ভাবছেন 'খাইবারপাস' আজকের দিনে কেনো হঠাৎ করে লাভগুরু হয়ে গেলো! আরে বাবা তা নয়,আমরা ওই রোজজার মত 'খাওয়ারের' কথাই বলতে এসেছি।আর আজও তার অন্যথা হবে না।কিন্তু আজ যেহেতু ভালোবাসার দিন তাই একটু হদিশ দেওয়ার চেষ্টা করছি; এমন কোন্ জিনিস পেলে আপনার প্রিয় মানুষটার মন জিতে নিতে পারবেন? আছে বইকি! দেখুন উদরের তৃপ্তি না হলে তো প্রেম জানলা দিয়ে পালাবে,আর যেখানে প্রেমিক বা প্রেমিকার 'মিষ্টি মুখ' দেখে প্রেমের গান গাইতে ইচ্ছে করে সেখানে যদি এক বিশেষ কোনো 'মিষ্টি' মুখে দিয়ে ভালোবাসার মানেটাই বদলে দেওয়া যায় তাহলে সেই সুযোগ নেবেন নাই বা কেনো!!! তাই আজ 'খাইবারপাস' হাজির করতে চলেছে এক মিষ্টির ইতিহাস যা আপনার প্রিয় জনের ওই 'মন' টাকে 'হরণ' করতে যথেষ্ট। তাহলে চলুন খাওয়া যাক....


আজ যে মিষ্টির ইতিহাসের গল্প করতে এসেছি তা হয়তো এতক্ষনে এত গৌরচন্দ্রিকায় আপনারা বুঝেই গেছেন।আর যেখানে 'জীবন মানে' টিভি সিরিয়াল রোজকার জীবনে, সেখানে 'মনোহরার' মত অতীব 'মিঠাই' যে আজ আপনাদের আলাদা করে তৃপ্তি দেবে তাতে সন্দেহ নেই।


মনোহরা হল বাংলার এক অতি জনপ্রিয় মিষ্টি। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার জনাই অঞ্চল এবং মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙার মনোহরা অতি বিখ্যাত। ... মনোহরা মূলত ছানা ও চিনির অথবা সরচাঁছি ও ক্ষীরের মিশ্রণের গোল্লা জাতীয় মিষ্টি।তবে এর বিশেষত্ব হল এই মিষ্টির উপর বাইরের দিকে চিনির স্তর দেওয়া একটি গোলকাকৃতি আবরন থাকে যা এই  মিষ্টিকে ভিন্নতা দিয়েছে।

মনোহরা না পুরোপুরি রসগোল্লা জাতীয় রসের মিষ্টি, আবা

মনোহরার ইতিহাস।

র না পুরোপুরি সন্দেশ গোত্রীয়৷ যাঁরা খেয়েছেন তাঁরা জানেন, দুধ-চিনির চাদরে মোড়া মনোহরা কেন বাঙালির মন হরণ করে৷এখানেই হয়তো মনোহরার ইউএসপি।তবে বর্তমানে কলকাতার বিখ্যাত মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক গিরীশচন্দ্র দে ও নকুড়চন্দ্র নন্দী, চিনির বদলে এই আস্তরনে নলেন গুড়ের প্রলেপ দেওয়া মনোহরার প্রচলন করেন।


তবে কবে কীভাবে এই মিষ্টির জন্মে হল আসুন তা একটু জেনে নিই,আর এটাও জেনে নিন কেনোই বা মনোহরার বাইরে মোটা পুরু আস্তরণ থাকে। মনে করা হয়, মোটামুটি দু’শো বছর আগে নাকি এই মিষ্টি প্রথম তৈরি হয়েছিল৷ কলকাতা থেকে এক বিখ্যাত সাহেব হুগলির জনাইয়ে বেড়াতে এসেছিলেন৷ ভীমচন্দ্র নাগের বংশধরদের একটি শাখা তখন জনাইয়ের ষষ্ঠীতলায় বসবাস করতেন৷ তখন তো আর খাবার সতেজ রাখার জন্য ফ্রিজ এর চল ছিল না৷ সাহেব হুকুম করলেন এমন মিষ্টি বানাতে হবে যা দিন পাঁচেক রেখে খাওয়া যাবে৷ ময়রারা পড়লেন মহা ফ্যাসাদে। ভাবতে বসলেন কী করা যায়৷


তাঁরা তখন এটা মাথায় আনলেন যে মিষ্টিতে যদি কোনও ভাবে হাওয়া লাগানো বন্ধ করা যায়, তা হলেই একমাত্র এটা হতে পারে৷ তাঁরা তখন ইতিমধ্যেই শুকনো বোঁদে আর নিখুঁতি তৈরির কৌশল জানতেন৷ জনাইয়ে এই দুই মিষ্টি তখন এমনিতেই বিখ্যাত ছিল৷ তখন সেই ময়রারা তৈরি করলেন এক মিষ্টি যা ছানা ও চিনির সঙ্গে ছোটএলাচ মিশিয়ে ভালো করে আগুনে জ্বালে পাক দিতে হয়৷ মিশ্রণটা গাঢ় হয়ে মাখা সন্দেশের মতো হয়ে এলে আগুন থেকে নামিয়ে রাখলেন এবং লক্ষ্য রাখলেন যেন দানা দানা ভাব থাকে এই পাক দেওয়ার সময়৷ মিশ্রণ ঠান্ডা হলে মণ্ড তৈরি করে তা হাতের তালুতে রেখে গোল করে পাকিয়ে নিলেন। চিনি ও দুধ ফুঁটিয়ে ঘন করে তৈরি গরম মিশ্রণে একটা একটা করে সন্দেশ ডুবিয়েই তা তুলে নিয়ে রাখলেন কলাপাতার উপরে৷ মিনিট তিন-চারেকের মধ্যেই তা শুকিয়ে গেলো৷ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে গেল সেই আস্তরণও৷যার মধ্যে হাওয়া-বাতাস লাগে না বলে ব্যাকটিরিয়াও ঢুকতে পারে না সহজে৷ তাই বেশ তিন থেকে পাঁচ দিন রেখে এই মিষ্টি খাওয়া যাবে বলে তাঁরা মনে করলেন৷ এবং ইহাই তৈরি করে হাতে তুলে দিলেন সেই সাহেবকে।


সাহেব দেখলেন ডিমের খোসার চেয়ে একটু পাতলা এই আস্তরণ ভেঙে নিয়ে ভেতরে মিষ্টি খেতে হয়৷এবং যা অনেক দিন ধরে রেখেও খাওয়া যাবে।সাহেব কলকাতা ছুটলেন এবং এই অসাধারণ এক সৃষ্টিতে মোহিত হয়ে গেলেন।আর এর স্বাদে এতটাই মুগ্ধ হ'ল সকলে যেন সকলের মনটাই চুরি করে নিল এই মিষ্টি।আর এই মন হরণ থেকেই এই মিষ্টির নাম হয়ে গেলো 'মনোহরা'।


তবে জনাই তেই কি এর সৃষ্টি এই নিয়ে মতভেদ আছে।কেউ কেউ বলেন মূর্শিদাবাদের বেলডাঙাই আসলে মনোহরার আতুরঘর। মুর্শিদাবাদের কান্দি, বেলডাঙ্গার মনোহরার সুখ্যাতি সেকালে কালাপানি পাড় হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ছিল সূদুর সাহেবদের দেশেও। চাঁচি ক্ষীর আর ছানার সঙ্গে এলাচ, জায়ফল আর জয়িত্রীর মিশ্রণে তৈরি মোটা চিনির মোটা রসের আস্তরণে ঢেকে রাখার অননুকরণীয় শিল্পের নামই মনোহরা।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রজগোপাল সাহা বেলডাঙ্গায় প্রথম মনোহরা তৈরি করলেন বলে একটি মত মনে করে। বাংলার মিষ্টির ইতিহাস নিয়ে যারা চর্চা করেন মনোহরার জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে তাঁদের মধ্যে অনেক মতভেদ আছেই। সে যাই হোক,দুধসাদা মনোহরার আদি ঘর যাই হোক না কেনো, এখনো জনাই বা বেলডাঙা দুজায়গাতেই সমান ভাবে সমাদৃত এই মিষ্টি।


আর জন্মবৃত্তান্ত যখন জানাই হয়ে গেলো,আর মনোহরার মত ম্যাজিকাল মিষ্টির খোঁজ যখন দিয়েই দিলাম তাহলে আজ এক বাক্স মনেহরা নিয়ে প্রেমিক বা প্রেমিকার হাতে তুলে দিয়েই দেখুন না ভালোবাসা বাড়ে কি না!আর যেখানে এক প্রত্যন্ত এলাকার তৈরি মিষ্টিই দুঁদে সাহেবদের 'মন হরণ' করে ফেলেছিল এক লহনায় সেখানে আপনি আশাহত যে হবেন না এ কথা হলফ করে বলতে পারি আমরা 'খাইবারপাস', আর তা হলেই হবে আমাদের এই লেখার সাফল্য। 


সকলে মিষ্টি মুখে থাকুন,সকলে ভালোবাসায় থাকুন।






8 মন্তব্যসমূহ

  1. আহা,,,লেখাটা তো দারুণ মিষ্টিটাও

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন