শীতল ষষ্ঠীর আখ্যানে বাঙালির ঐতিহ্য গোটা সেদ্ধ। লেখায়- অভ্রনীল রায়।


মাঘ মাসের শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে৷ বাঙালি ঘরে ঘরে  আরাধনা করা হয় বিদ্যার দেবী সরস্বতীর।আর সরস্বতী পুজোর দিনে বিকেলে প্রায় প্রতি বাড়িতেই বিশেষ করে যারা এদেশীয় অর্থাৎ ঘটি তাদের মধ্যে গোটা সেদ্ধ'র পালা-পার্বণ থাকে।

শীতল ষষ্ঠীর আখ্যানে বাঙালির ঐতিহ্য গোটা সেদ্ধ।


 সরস্বতী পুজো হয় পঞ্চমী তিথিতে, এর পরদিন হয় ষষ্ঠী। এই ষষ্ঠী আসলে শীতল ষষ্ঠী নামেই পরিচিত। আর এদিন সবই শীতল মানে, ঠান্ডা খেতে হয় এটাই নিয়ম। আর নিয়ম এতদূর কড়া যে, ব্রতধারিণীরা সকালে গরম চা-ও খান না! তবে কী করে তৈরি হয় এই গোটা সব্জী? আসুন সেটা একটু জেনে নিই।


সরস্বতী পুজোর দিন বিকেলেই সমস্ত সবজি গোটা অবস্থায় সেদ্ধ করা হয়। হাঁড়িতে জল নুন দিয়ে সেদ্ধ করা হয় এই সমম্ত সবজি। তেল বা হলুদ দেওয়া হয় বা হয় না, সেটি নিয়মকারী সংশ্লিষ্ট পরিবারের নিজস্ব নিয়মমাফিক। এই গোটা রান্নায় থাকে গোটা আকারের বেগুন, গোটা সিম, গোটা ছোট আলু, গোটা কড়াইশুঁটি, গোটা রাঙালু, গোটা ছোলা-মটর সহ পাঁচরকম কড়াই, সজনে ফুল, শিষওয়ালা পালং এবং পুঁই শাকের ডাল। এর সঙ্গে কুলের টক খাওয়ারও একটা রীতি থাকে। আর সেই সংগে থাকে জল দিয়ে রেখে দেওয়া ঠান্ডা ভাত। পঞ্চমীর বিকেলে এসব রেঁধে রেখে পরদিন অর্থাৎ ষষ্ঠীর সকালে এসব খাওয়া হয়।এবং সেসব গরম না করেই ঠান্ডা করে খাওয়া হয়। 


শীতল অবস্হায় কিছু বাঙালি কালচারে এই যে গোটা খাদ্য গ্রহণের যে-প্রথাপশ্চিমবঙ্গের বহু অঞ্চলে প্রচলিত তার অন্তরালে হয়ত আঞ্চলিক কিছু শস্যকেন্দ্রিক-ধর্মধারার অবশেষ আছে। এ ছাড়া এর পিছনে একটা বৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক ব্যাখ্যাও কিন্তু রয়েছে। এর পেছনেও যুক্তি? এ'তো নিছক ধর্মীয় রীতিনীতি! কিন্তু 'খাইবারপাস' তো আর এভাবে ব্যাখা না করে ছেড়ে দেয় না!!!!! তাহলে জেনে রাখুন, একটু  শীত শেষেই হয় বসন্ত ঋতুর আগমন। এ সময় শরীরে জীবাণুর বাসা বাঁধতে শুরু করে।এটি এই ঋতুবদলের সময়ে যে রোগ-ভোগগুলি লেগে থাকে তার সঙ্গে লড়াই করার প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচ সরবরাহ করে শরীরকে। রোগপ্রতিরোধ শক্তি জোগায় শরীরে।এই সব রোগের হাত থেকে বাঁচতে এই সব টোটকার খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সুচারু কোনো গবেষণা হয়েছে কিনা জানা নেই, তবে মনে হয়, এটাই মুখ্য কারণ। আর গোটা শস্য রান্নার ফলে পরিবারকে সামগ্রিকভাবে একত্রিত রাখার একটা প্রয়াসও রয়েছে।যা বহু দিন ধরেই পরম্পরায় চলে আসছে।


খুবই সুস্বাদু এই সেদ্ধ। তবে মানুষকে এমনি এমনি এই সেদ্ধ ঠান্ডা খাবার খেতে বললে হয়তো তাঁরা তা খাবেন না। তাই মনে করা হয়, যাঁরা এই সব নিয়ম-কানুন তৈরি করেছিলেন, তাঁরা ইচ্ছে করেই এটি শীতল ষষ্ঠী ব্রতের সঙ্গে বেঁধে দিয়েছেন। যাতে মানুষ বাধ্যতামূলক ভাবে এটি মেনে চলে।   


আর এভাবেই রৌদ্রকরোজ্জ্বল আবহাওয়া,শাড়ি-পাঞ্জাবির যুগলবন্দী, জোড়া ইলিশ,অঞ্জলির হুড়োহুড়ির সাথে গোটা তরকারি খাওয়া সবটা মিলেই যেন জমে ওঠে বাঙালির ভ্যালেন্টাইন,বাংলার আবেগ বাগদেবীর আরাধনা....


 

5 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন