সিমই এর ইতিহাস। লেখায়-অভিজিৎ সূত্রধর

 শীত মোটামুটি ভালই পড়েছে আর কিছুদিন গেলেই পৌষ পার্বণ । খাদ্যরসিক দের কাছে এই পৌষ পার্বণের একটা আলাদা মাহাত্ম আছে , থাকবে নাই বা কেনো বলুন সুস্বাদু পিঠাপুলি রয়েছে বলে কথা। কুয়াশা ভরা সকালে গরম গরম দুধপুলির গায়ে আলতো ভাবে কামড় বসাতে কে বা না চায়। তবে আজ কোনো পিঠে নিয়ে কথা নয় বরং বলতে পারেন আজ কথা হবে একধরনের পায়েস নিয়ে। আমি বলছি সেমাই এর কথা । আহা বুঝতে পেরেছি আপনি ভাবছেন সেমাই তো সাধারণত পবিত্র ঈদের দিনের খাবার কিন্তু মশাই আমরা বাঙালি কেনো এই সুস্বাদু খাবার কে খালি ধর্মীয় দিনের জন্য তুলে রাখবো বলুনতো মশাই। আর ইদানিং বিখ্যাত খাদ্যগবেশক ইন্দ্রজিৎ  লাহিড়ী তার ইউটিউব চ্যানেল ফুডকা তেত বলছেই " খাবারের না আছে ধর্ম না আছে জাত শুধু লাগাও হাত"

শীত মোটামুটি ভালই পড়েছে আর কিছুদিন গেলেই পৌষ পার্বণ । খাদ্যরসিক দের কাছে এই পৌষ পার্বণের একটা আলাদা মাহাত্ম আছে , থাকবে নাই বা কেনো বলুন সুস্বাদু পিঠাপুলি রয়েছে বলে কথা। কুয়াশা ভরা সকালে গরম গরম দুধপুলির গায়ে আলতো ভাবে কামড় বসাতে কে বা না চায়। তবে আজ কোনো পিঠে নিয়ে কথা নয় বরং বলতে পারেন আজ কথা হবে একধরনের পায়েস নিয়ে।


আমরা বাঙালিরা সাধারণত সেমাই ছাড়া ঈদ উদযাপন কল্পনা করতে পারি না। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, ঈদের সাথে সেমাইয়ের এই যোগসূত্র যে  খুব পুরনো তা কিন্তু নয়। ইতিহাসবিদদের মতে, গত শতক থেকেই ঈদে ঘরে ঘরে সেমাই তৈরির এই সংস্কৃতি গড়ে উঠতে শুরু করে । সাধারণত ঈদের দিন সকালে সেমাই হতেই হবে। নিয়ম অনেকটা এমন যে, বাড়ির পুরুষরা নামাজে যাওয়ার আগে কিংবা নামাজ থেকে ফিরে সেমাই খাবেন। বাড়ির গৃহিনীরাও সেই সেমাই খুবই যত্ন সহকারে আন্তরিক ভাবে  রান্না করেন। আর নানা রেসিপিতে তৈরি হয় এই সুস্বাদু সেমাই।


ঐতিহাসিকদের মতে, উনিশ শতকের শেষের দিকে ঈদে সেমাই খাওয়ার কথা পাওয়া যায়। তবে আমাদের এই  বাংলা অভিধানে কিন্তু সেমাই  শব্দটাকে কোথাও বলা হয়েছে দেশি, আবার কোথাও বলা হয়েছে হিন্দি। ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এই বিষয় নিয়ে তার মতামত হলো এই যে, গ্রিক শব্দ সেমিদালিস থেকে নাকি সেমাই শব্দের উৎপত্তি। যদিও এটি সরাসরি ঘটেনি।সাধারণত  সেমিদালিস শব্দের মূল অর্থ হলো ময়দা।আর  ময়দা অবশ্য ফারসি শব্দ। এই সেমিদালিস শব্দ সংস্কৃত ভাষায় প্রবেশ করে সমিদা রূপ ধারণ করে। আর এই সমিদা থেকেই আমাদের প্রিয় খাবার  সেমাই, সেমিয়া ইত্যাদি শব্দ তৈরি হয়েছে ।আমরা ইতিহাসে পড়েছি যে যিশু খ্রিস্ট জন্মের 326 বছর আগে আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের মধ্য দিয়ে গ্রিসের সঙ্গে ভারতের পরিচয় ঘটে। আর সেই সময় খাদ্যদ্রব্য হিসেবে সেমিদালিস বা ময়দার সঙ্গে ভারতের পরিচয় ঘটা বিচিত্র ব্যাপার কিন্তু নয়। এই যে সেমিদালিস এর সমিদা হওয়া এবং সমিদা থেকে সেমাই হওয়া ভাষাতত্ত্বে নতুন কোনো ঘটনা কিন্তু নয়। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সেমাই শব্দের বুৎপত্তি নির্দেশ করে দেখিয়ে দিয়েছেন—সেমাই শব্দের গায়ে গ্রিসের গন্ধ থাকলেও সেমাই দ্রব্যটা আসলে ভারতীয়।

সিমই এর ইতিহাস


বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ছিটেফোঁটা মধ্যযুগের ইতিহাস গ্রন্থে যেটুকু পাওয়া যায় তার মধ্যে সেমাইয়ের উল্লেখ আমরা কিন্তু পাই না । পুরনো ঐতিহাসিক গ্রন্থ গুলিতে ফিরনির উল্লেখ আছে। নবাব আলিবর্দী খাঁর খাদ্য তালিকায় খিচুড়ির উল্লেখযোগ্য অবস্থান ছিল। সেমাইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না মোগল রসুইঘরেও। অর্থাৎ সেমাই মোগলাই খাবারের মধ্যে ও পড়ে না।

মধ্যযুগের সাহিত্যে অনেক খাবারের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু সেমাইয়ের নাম কোথাও নেই।

ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষাতে সেমাইয়ের নাম একেক রকমের। বাংলা অবশ্য সেমাই। তবে হিন্দি, উর্দু ও পাঞ্জাবিতে সেমিয়া অথবা সেভিয়াঁ। মারাঠিতে বলে সেমাইয়া, গুজরাটিতে সেই এবং তেলেগু, তামিল ও মালায়লামে সেমিয়া।

ভারতের অনেক অঞ্চলে অবশ্য সেমাইয়ের দুই রূপ—­এক হলো নামকিন সেমাইয়া, অন্যটা হলো সেমিয়া সেভিয়াঁ ক্ষীর। অর্থাৎ তা মিষ্টি।কিন্তু আমাদের এই  বাংলা তে সেমাইয়ের স্বাদ একটাই—আর তা হলো মিষ্টি।

সেমাইয়ের খানিকটা আন্তর্জাতিক মান ও আছে। বাঙালি সেমাই ভিন্ন নামে আছে  আফ্রিকার সোমালিয়াতে। সেখানে তার নাম কাদ্রিয়াদ। বাংলাদেশে শুধু ঘি দিয়ে ভেজে যেভাবে দমে সেমাই রান্না হয়, সোমালিয়ার কাদ্রিয়াদ রান্নার প্রণালি সেই একই রকম।


সেমাই দুই ভাবে এখন তৈরি । যথা হাতে তৈরী সেমাই ও মেশিনে তৈরী সেমাই। সেমাই আটার মণ্ডকে সরু ও দীর্ঘ ফালিতে ভাগ করে প্রস্তুত করা হয়। বর্তমানে সেমাই মূলত যান্ত্রিক পদ্ধতিতে মেশিনে তৈরি করা হয়, যা বাজারে প্যাকেটজাত করে বিক্রয় করা হয়। আর এর ফলেই সমগ্র বিশ্বজুড়ে এই সেমাইয়ের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে  তবে পূর্বে ঘরে সেমাই তৈরির চল ছিল, যা মূলতঃ বাড়ির মেয়েরা হাতে কেটে তৈরি করতেন এবং এটি সাধারণত বেশ সময়সাপেক্ষ একটি কাজ।

সেমাই এখন দুই প্রকারের। তার সেমাই বা খিল সেমাই। আরেকটা হলো লাচ্চা বা লাচ্চি সেমাই। এ সেমাইয়ের প্রকরণ আবার  আলাদা। আগে পাওয়া যেত ঘিয়ে ভাজা। এ সেমাইয়ের উৎপত্তি কোথায় তা জানা যায় না এবং সঙ্গে সঙ্গে নামটা লাচ্চা হলো কেন তাও বলা মুশকিল। আরবি লম্বুতদার শব্দ ঢাকার আদি বাসিন্দাদের মুখে উচ্চারিত হতো লাচ্ছাদার। লম্বতদার শব্দের অর্থ সুস্বাদু। লাচ্ছাদার মানেও তা-ই। হতে পারে এই লাচ্ছদারই লাচ্ছি হয়ে সেমাইয়ের আগে বসে গেছে।


সেমাই এর ইতিহাস যাই বলুক না কেন কিংবা এর উৎপত্তি যেখানেই হোক বা না কেনো আমরা বাঙালিরা কিন্তু এই খাবার কে একদম নিজের করে নিয়েছি।

 এই সেমাই যে কবে যে ঈদের মত এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের এক বিশেষ অংশে পরিণত হয়ে গেলো তাও বলা মুশকিল। তবে এখন দেখা যায় এই খাবারটি জন্যই ঈদ উল ফিতর কিনা সেমাই ঈদ নামে পরিচিতি পেয়েছে। ঈদের দিনে রাস্তার ধরে কত যে এই সেমাইয়ের স্টল বসে তার ইয়াত্তা নেই ।এর ফলে যে কত ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ীর মুখে হাসি ফোটে তারও ইয়েত্তা নেই। তবে এই টুকু বলতে পারি এই খাবারটি এখন আর কোনো ধর্মীয় অনুঠানের খাবার বলে পরিচিত নেই এই খাবার সমস্ত ধর্ম নির্বিশষে সমাদৃত এবং প্রশংসনীয় ।তাহলে আর কি ভাবছেন চলুন আজই হয়ে যাক এক প্লেট করে সেমাই।

4 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন