বাঙালি বিয়েবাড়ির খাবার-দ্বিতীয় পর্ব লেখায়-অভিষেক রায়

আগের পর্বেই আমরা জেনেছি অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের বাংলার বিয়ে বাড়ির কথা।বিশেষ করে মেনু কীভাবে বদলাতে থাকলো যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তারই কিছুটা হদিশ দিয়েছিলাম।ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম অংশে বাঙালি বিয়েতে প্রধানত নিরামিষ খাবারেরই আধিক্য ছিল।তবে বিয়েবাড়িতে ভাত খাওয়ানোর প্রচলন সেরকম ছিল না।বড় বড় ঘরে তৈরি ঘি-এ ভাঁজা লুচির সাথে ছোলার ডাল,পটল ভাজা,শাক ভাজা,কপি ঘন্ট,মেশানো তরকারি ও বিভিন্ন রকম মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য বিশেষত রসগোল্লা,কড়া পাঁকের সন্দেশ,ক্ষীর,ঘরে তৈরি পায়েস বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল।এসময় প্রধানত বাড়ির মা কাকিমারাই ব্যাপার বাড়ির রান্নার দায়িত্ব তুলে নিতেন।দু একটি পুরনো বই থেকে সে সময়ের বড়লোক পারিবারিক বিয়ের ভোজ সম্বন্ধে জানা যায়,লুচির সাথে প্রায় ১২ থেকে ১৫ রকমের সব্জি,৮-১০ রকমের মিষ্টি ও এলাহি পরিমাণ ঘরে তৈরি পায়েস খাওয়ানো হচ্ছে।

বাঙালি বিয়েবাড়ির খাবার-দ্বিতীয় পর্ব


এই শতকেরই মাঝামাঝি সময় প্রায় ১৯৪২ সালের পর থেকে বাংলায় বিয়ে বাড়ির মেনুতে অন্যতম প্রধান মিষ্টি হয়ে ওঠে জয় হিন্দ সন্দেশ। ১৯৪২ থেকে ১৯৫৭ এই সময়ো ভারতের স্বাধীনতা ও সংগ্রামের প্রতীক রূপে বরফি সন্দেশের তিনটি স্তরে গেরুয়া,সাদা,সবুজ এই তিনটি রঙ করে জয়হিন্দ সন্দেশটি তৈরি হত,যা সেইসময়কার বিয়ের মেনুতে বিশেষ পদ যেনো অলঙ্কার করতো।আবার এই সময়েই বাংলায় বেশ কিছু ব্র্যান্ডেড মিষ্টির প্রচলন হওয়ায় ভোজের পাতে ব্র্যান্ডেড মিষ্টি দেওয়া শুরু হতে থাকে।যার মধ্যে প্রধানত বর্ধমানের সিতাভোগ,স্বরূপগঞ্জের পান্তুয়া,শান্তিপুরের নিখুতি,বহরমপুরের ছানাবড়া,মুড়াগাছার ছানার জিলিপি,দিগনগরের দেদোমন্ডা,কালীগঞ্জের রসকদম,নবদ্বীপের বেদানা বোঁদে,কৃষ্ণনগরের সরভাজা,দ্বারিকের গোলাপ সন্দেশ ইত্যাদি ছিল অন্যতম।১৮৭০-৭২ সাল থেকে দু-একটি ব্যতিক্রমি বাঙালি বাড়িতে মাছের প্রচলন শুরু হলেও এই সময় থেকেই ধীরে ধীরে উচ্চ মধ্য বিত্ত অব্রাহ্মন বাড়ির বিয়েরভোজে মাছ খাওয়ার চল দেখা যায়।যদিও সেই সময় প্রধানত লুচির সাথে মাছ খাওয়ানো হত বিয়ে বাড়িগুলিতে।

এর পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে মাছ,পাঠার মাংস,আমিষ জাতীয় সব্জি যেমন মুড়িঘন্ট,মাছের মাথা দিয়ে মুগডাল মাছের মাথা দিয়ে ছ্যাছড়া প্রভৃতি খাবার খাওয়ানোর চল শুরু হয়।এবং রান্নার জন্য বিশেষ ভাবে রান্নার ঠাকুরের কনসেপ্ট আসে,যারা বেশীরভাগ জাতিতে উড়িশ্যার অধিবাসী ছিলেন। এই সময়ের আরেক উল্লেখযোগ্য সংযোজন হল পোলাও।কৃষ্ণনগরের মহারাজা সৌরিশ চন্দ্র রায়ের পাকা দেখা অনুষ্ঠানের মেনুতে পাঁচ রকমের পোলাও(মতি পোলাও,বাসন্তী পোলাও,সাদা পোলাও,মটরশুঁটির পোলাও,আমিষ পোলাও)ও আট রকমের মাছের পদ(রুই পেটি,ভেটকি ফ্রাই,রুই দমপোক্ত,কই পাতুরি,চিংড়ি মালাইকাড়ি প্রভৃতি),পাঁচ রকমের মাংস(মুর্গির মাংস বাদে),বারো রকমের নিরামিষ তরকারি(কুমড়োর হুসেনশা,লাও রায়তা,ফুলকপির জামাইভোগ,বাঁধাকপির বুকধড়ফড়ি,পাপড় কারি,আলুর জয়হিন্দ ইত্যাদি) যা সেইসময়কার অভিজাত বিয়ে বাড়ির এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

তখন বিয়েবাড়িতে খানেবালা আমন্ত্রিতের সংখ্যাও ছিল অনেক।৫০-৬০ পিস মাছ,১০০ পিস রসগোল্লা এরকম খাওয়া লোকের সংখ্যা ছিল অনেক।তাই উঁড়িয়া ঠাকুরের পরামর্শে মধ্যবিত্ত বাঙালি সহজেই মুখ মেরে দেওয়ার মত ব্যবস্হা করতেন।যার মধ্যে ছিল পোলাওতে ডালডা বা ঘি এর আধিক্য অথবা সন্দেশ পরিবেশনের আগে প্রচুর মিষ্টি দেওয়া দরবেশ বেশী পরিমানে পরিবেশন করা।

১৯৮০-৮৫ সাল নাগাদ প্রধানত কলকাতার বিয়ে বাড়িতে এক বিশেষ খাবারের আবির্ভাব ঘটে যা আজকের দিনে কলকাতার বিয়ে বাড়ির প্রধান উপকরন।হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন,তা হল বিরিয়ানি এবং চিকেন চাপ।তবে সেটা খুব কম পরিমান বিয়ে বাড়িতেই সেই সময় থাকতো,আর মূলত দক্ষিনবঙ্গের অভিজাত বিয়েতে এর চল ছিল।

ইডেন গার্ডেনে বিদেশি ক্রিকেট টীম গুলোকে খেলার সময় খাওয়ার পরিবেশনের জন্য প্রথম ডাক পরেছিল দীপ্তি কেবিন বলে একটি সংস্থার।ভবানীপুরের বিজলি সিনেমাহলের পেছনে থাকা এই ছোট্ট সংস্থাটি পরিবর্তিতে নিজেদের নাম পরিবর্তন করে রাখে বিজলি গ্রিল।আনন্দবাজার পেপারে খেলোয়াড়দের বিজলিগ্রিলের খাওয়ার পরিবেশনের খবর পৌঁছানোর সাথে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সংস্থাটি,আর তৈরি হয় বাংলার প্রথম ব্র্যান্ডেড ক্যাটারার বিজলি গ্রিলের এবং বিবর্তন আসে বাংলার বিয়ে বাড়ির খাবার পরিবেশনের।পাড়ার প্যান্টের উপর গামছা পরিহিত ডাবু হাতা নিয়ে দৌঁড়াদৌড়ি করে পরিবেশন করা লাল্টু, বিলটু,খোকনদের জায়গা নিতে থাকে শার্ট প্যান্ট পরা ভদ্র সভ্য খাবার সার্ভ করা ক্যাটারিং সংস্থার।তবে ক্যাটারিং এর সূচনা তখন হলেও তার প্রচলন বেশী মাত্রায় একবিংশ শতকেই হয়।

বাঙালি বিয়েবাড়ির খাবার-দ্বিতীয় পর্ব


(দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত-আসছে তৃতীয় পর্ব)

4 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন