বাঙালির খাদ্যের আদিপর্ব ও আধুনিক ইতিহাস চর্চা। লেখায়- আলোক সরকার (নীল দা)

"আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণ উচাইয়া তর্জনাঙ্গুলি সদর্পে কন,

বাঙালি বামুনের পো খাস তুই মাছ,

ছি. ছি. ছি., হবে তো নির্ঘাত নরকবাস।"

(আলোক সরকার)


আজ ভাবছি খাইবারপাসের এই অঙ্গনে দাঁড়িয়ে ইতিহাস চর্চা করব। না! ভয় পাবেন না। শুকনো চিড়ের মতো রসকষহীন খটখটে তাত্ত্বিক ইতিহাসচর্চা নয়। রীতিমতো আপনার প্রিয় খাবারের মতোই সুস্বাদু অথবা শীতকালীন নলেন গুড়ের রসগোল্লার মতোই রসালো ইতিহাস। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় ইতিহাস, বাংলা ও বাঙালির খাদ্যের আদিপর্বের ইতিহাস। খেতে না চাইলে চেখে দেখুন, গ্যারান্টি দিচ্ছি স্বাদ পাবেন,অনেক স্বাদ।

বাঙালির খাদ্যের আদিপর্ব ও আধুনিক ইতিহাস চর্চা।


সময়টা ১৯৬০-৭০-র সত্তরের দশক। রাজা-রাজাদের কাহিনী অর্থাৎ রাজনৈতিক ইতিহাস চর্চার পরিবর্তে শুরু হয় "নতুন সামাজিক ইতিহাস" চর্চা। আপনার খেলা, আপনার পরিবেশ, আপনার সমাজের নারী ও তাদের অবস্থান, আপনার অঞ্চল, গ্রাম ও শহর, যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, সমাজের সাধারণ মানুষ সর্বোপরি খাদ্যাভ্যাস নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি শুরু হয়, যাকে আমরা "নতুন সামাজিক ইতিহাস" বলি। এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে খাদ্যের আবার ইতিহাস চর্চা হয় নাকি? হয়! খাদ্যেরও ইতিহাস হয়। দেখবেন শিখ,পাঠান, গোর্খা, রাজপুত প্রতি জাতিগুলি কী ব্যাপকমাত্রায়  সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। সেই তুলনায় বাঙালি জাতির যোগদান প্রায় নগণ্য (সংখ্যাটা উত্তরোত্তর বাড়ছে)।১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পর তৎকালীন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সামরিক বিভাগে প্রচুর পরিবর্তন করেন। তারা ঘোষণা করেন-" রুটি খাওয়া ভারতীয়রা অনেক বেশি শক্তিশালী ভাত খাওয়া ভারতীয়দের থেকে।"এইরূপ অবস্থায় রুটি খাওয়া ভারতীয় অর্থাৎ শিখ, গোর্খাও পাঠান প্রভৃতি জাতিগুলিকে "সামরিক জাতি" আখ্যা দিয়ে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে তাদের নিয়োগ অধিক করা হয়( যদিও শারীরিক শক্তির পাশাপাশি ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের সময় ভারতীয়দের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সাহায্য করার পুরস্কার স্বরূপ এই জাতিগুলোকে "সামরিক জাতি" আখ্যা দিয়ে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছিল)। আবার খাদ্যের সঙ্গে মানুষের ভৌগোলিক অবস্থান, পরিবেশ,ধর্মীয় বিশ্বাস, আর্থিক অবস্থান প্রভৃতিও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তাহলে বুঝতেই পারছেন খাদ্য ও তার ইতিহাসচর্চা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। এই গুরুত্বকে মাথায় রেখেই হয়তো "পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ" দশম শ্রেণির ইতিহাস বইতে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসকে সংক্ষিপ্ত আকারে স্থান দিয়েছেন।


এবার আসি মূল আলোচনায়, আদি পর্বে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিল? দৈনন্দিন  জীবনাচরণের ভেতর দিয়ে সত্য ও সৌন্দর্যের প্রকাশ করাই তো সংস্কৃতির মৌলিক বিকাশ। আর সর্বভূক মানুষের দৈনন্দিন জীবন ধারণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তার খাদ্য; বেঁচে থাকার খাদ্য। বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ মাঁসলো তার "চাহিদার পিরামিডে" খাদ্যকে স্থান দিয়েছেন সর্বাগ্রে।মাঁসলোর মতে আমাদের জৈবিক চাহিদা গুলো অর্থাৎ খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান হলো প্রাথমিক বা মৌলিক চাহিদা। এগুলো সঠিকভাবে পূরণ হলেই পরবর্তী চাহিদাগুলোর প্রতি আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়।


ইতিহাসের ঊষাকাল থেকেই "ধান্য" বা ধান যে দেশের প্রধান উৎপন্ন বস্তু সে দেশে প্রধান খাদ্য যে ভাত-ই হবে সে বিষয়ে হয়তো কারও কোন সন্দেহ নেই। বাঙালীদের ভাত খাওয়ার এই অভ্যেস অস্ট্রিক ভাষাভাষী "আদি অস্ট্রেলীয়" জনগোষ্ঠীর দান। কী ধনী কী গরিব ভাত-ই ছিল বাঙালির প্রধান খাদ্য।

" হাঁড়িত ভাত নাহি, নিত্তি আবেশী" (হাঁড়িতে ভাত নেই নিত্যদিন উপোস) এটাই ছিল বাঙালির জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ। গরম ধূমায়িত ভাত ঘৃত সহযোগে খাওয়াই ছিল সাধারণ রীতি। চতুর্দশ শতকের শেষের দিকে লিখিত (?) "প্রাকৃত পৈঙ্গল"গ্রন্থে বলা হয়েছে- "ওগগরা ভত্তা গাইক ঘিত্তা"অর্থাৎ গরুর ঘি সহযোগে গরম ধোঁয়াওঠা ভাত।আবার "নৈবধচরিতে" ভাত সম্পর্কে বলা হয়েছে-" পরিবেশিত অন্ন হইতে ধূম উঠিতেছে, তাহার প্রত্যেকটি কনা অভগ্ন, একটি হইতে আর একটি বিচ্ছিন্ন, যে অন্ন সুসিদ্ধ, সুস্বাদু ও শুভ্রবর্ণ, সরু এবং সৌরভময়" অর্থাৎ আমাদের প্রিয় সাদা, ঝরঝরে এবং সুগন্ধি ভাত। দুধ এবং মিষ্টি পায়েস ছিল ধনী সমাজের ভোজের অন্যতম প্রিয় খাদ্য বস্তু।

ভাত সাধারণত খাওয়া হতো শাক ও অন্যান্য ব্যঞ্জন সহযোগে। "প্রাকৃত পৈঙ্গল" বলা হয়েছে "নলিতা" বা পাটশাক ছিল বেশ প্রিয়। কলাপাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরালা মাছের ঝোল এবং নলিতা বা পাটশাক যে স্ত্রী নিত্য পরিবেশন করে তার স্বামী পুণ্যবান এবং তার সংসার সোনার সংসার। দই, পায়েস, ক্ষীর প্রভৃতি দুগ্ধজাত খাদ্য বাঙালি সেদিনও ভীষণ পছন্দ করত।***বিবাহ ভোজের খাওয়া ছিল আরো ব্যাপক।


মাংসের মধ্যে হরিণের মাংস ছিল খুবই প্রিয়। তবে ছাগ মাংসও সমাজে বহুল প্রচলিত ছিল। বিশেষভাবে শবর, পুলিন্দ প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোকেরা শিকারের সঙ্গে বিশেষভাবে হিসেবে যুক্ত থাকতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুকনো মাংস খাওয়া হতো। তবে যে কারণেই হোক শাস্ত্রকার ভবদেব ভট্ট কোন অবস্থাতে শুকনো মাংস খাওয়া অনুমোদন করেন নাই; বরং নিষিদ্ধই করেছেন। এর পুষ্টিমূল্য এবং স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করেই হয়তো এই সিদ্ধান্ত।


দেখুন খাওয়া নিয়ে এত কথা বলছি অথচ বাঙালির দৈনন্দিন খাদ্যের "মেন আইটেম" টাই ভুলে গেছি।

হ্যাঁ, মাছের কথা বলছি। খালবিল, নদনদী এবং সমুদ্র কেন্দ্রিক আদি অস্ট্রিক ভাষাভাষী বাংলার জনজাতির প্রধান খাদ্য বস্তুই ছিল মৎস্য বা মাছ। "বৃহধর্মপুরাণের"মতে- রোহিত, শফর বা পুঁটিমাছ, সকুল বা সোল এবং শ্বেতবর্ণ ও আঁশযুক্ত অন্যান্য মাছ ব্রাহ্মণদের ভক্ষণ যোগ্য। জীমূতবাহন ইল্লিস বা ইলিশ মাছের তেলের উল্লেখ ও বহুল ব্যবহারের কথা বলেছেন। মনে হয়, আজকের দিনের মত সেদিনেও ইলিশ মাছ বাঙালির অন্যতম প্রিয় খাদ্য ছিল। তবে সব মাছ কিন্তু ব্রাহ্মণের ভক্ষণযোগ্য ছিল না।"যেসব মাছ গর্তে বা কাদায় বাস করে, যাদের মুখ মাথা সাপের মত (যেমন বান মাছ), কদাকৃতি চেহারা, যাহাদের আঁশ নাই সেসব মাছ ব্রাহ্মণের পক্ষে খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল।"বাঙালিরা সিহুলি বা শুকনো মাছ খেতেও ভালোবাসতো (যত্র বঙ্গালবচ্চারনাং প্রীতি:)। যে ভালোবাসা আজও প্রায় অটুট। শামুক, কাঁকড়া, মোরগ (মুরগির মাংস বাঙালি রান্না ঘরে পুরোপুরি ঢুকেছে ১৯৮০/৯০-র দশকে), সারস, বক, হাঁস, উট,গরু এবং শূকর প্রভৃতি ব্রাহ্মণ্য স্মৃতিশাসিত সমাজে নিষিদ্ধ ছিল। মুরগির মাংস খাওয়ার বিষয়ে একটা কথা বলি।কয়েক বছর আগেও শোনা যেত, "হাঁস ও কুক্কুরা বা মুরগি খাওয়াব বামুনের কাছে বাড়ির পুজো করাবো না।"তবে আদিবাসী কৌম সমাজের অথবা "তথাকথিত" নিম্নবর্ণের মানুষদের শামুক, কাঁকড়া, মোরগ,বিভিন্ন অকুলীন মৎস্য, পক্ষীমাংস, গোধা,সজারু, কচ্ছপ খাওয়াতে কোন বিধি-নিষেধ ছিলনা। যদিও পরবর্তীতে পাল ও সেন যুগে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবে মানুষ আমিষ ছেড়ে নিরামিষে ঝুঁকতে থাকে।



"আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণ উচাইয়া তর্জনাঙ্গুলি সদর্পে কন,

বাঙালি বামুনের পো খাস তুই মাছ,

ছি. ছি. ছি., হবে তো নির্ঘাত নরকবাস।"


একবার ভাবুনতো, ভারতের অন্যান্য প্রান্তের ব্রাহ্মণরা মাছ না খেলেও বাঙালি ব্রাহ্মণ সমাজের কিন্তু মাছ খাওয়াতে বিশেষ আপত্তি নেই। বাঙালি ব্রাহ্মণের এই মৎস্য প্রীতিকে আর্যসমাজ কোনদিনই সুনজরে দেখেনি। মাছখেকো বাঙালি ব্রাহ্মণের প্রতি ছিল স্পষ্টতই অবজ্ঞা। তবে এই অবজ্ঞা বা নিষেধ কোনদিনও ধোপে টেকেনি। বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু এই জন্য দায়ী।গাঙ্গেয় নিম্নভূমির বাংলার যে মাটি তা মোটেও ডাল চাষের উপযুক্ত নয়। তাহলে বাঙালির পুষ্টির (প্রোটিনের)চাহিদা পূরণ হবে কী করে? আর স্বাভাবিকভাবেই খালবিল,নদী বহুল বাংলাদেশে মাছ পাওয়া যেত প্রচুর। ফলে মৎস্য প্রিয় বাঙালির পুষ্টির জন্য ডাল বা অন্য কিছুর উপর নির্ভর করতে হয়নি। বস্তুত মনু, যাজ্ঞবল্ক্য,ব্যাসদেব ও ছাগলেয় প্রমূখ প্রাচীন স্মৃতিকারদের মতামত উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলার প্রধান স্মৃতিকার ভবদেব ভট্ট বলেছেন-"চতুর্দশী,একাদশী , বিশেষ কোন তিথি নক্ষত্র বা দিন বাদ দিলে মৎস্য বা মাছ খাওয়াতে কোন দোষ নেই। আসলে মৎস্য এবং বাঙালির ভালোবাসা প্রথম প্রেমে পড়া প্রেমিকযুগলের মতই সুগভীর ও ব্যাপক। আমরা যারা রায়গুণাকর ভারতচন্দের "অন্নদামঙ্গল" কাব্য পড়েছি। সেখানে দেখতে পাই দেবী অন্নপূর্ণা  ঈশ্বরী পাটনীর নৌকাতে উঠে তাঁকে আশীর্বাদ চাইতে বললেন। তখন নৌকার মাঝি ঈশ্বর পাটনী দেবীর কাছে চেয়েছিলেন-

"আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।"নেহাত হিন্দু দেবীকে নিয়ে লেখা কবিতা তাই হয়তো ভারতচন্দ্র লেখাতে আমিষের প্রবেশ করানননি। কিন্তু আমার মনে হয় প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বর পাটনী দেবীর কাছে চেয়েছিল- "আমার সন্তান যেন থাকে মাছে ভাতে।"বাঙালির মৎস্যপ্রীতির পরিচয় পাহাড়পুর ও ময়নামতির পোড়ামাটির ফলক গুলোতেও দেখতে পাওয়া যায়। মাছ কোটা এবং ঝুড়ীতে মাছ ভরে হাটে নিয়ে যাওয়ার বাস্তব দৃশ্যও এই ফলক গুলিতে প্রতীয়মান। বাঙালি তার বাড়ির শুভকাজে এবং পূজা-পার্বণেও মাছের ব্যবহার করে থাকে।


মাছের পর বলি সবজির কথা সে যুগের বাঙালিরা বেগুন,লাউ,কুমড়ো,ঝিঙে,কাকরোল, কন্দ বা কচু প্রভৃতির ব্যবহার জানতো। ফলের মধ্যে ছিল কলা, তাল, আম-কাঁঠাল, নারিকেল, ইক্ষু প্রভৃতি। সুপুরি এবং তেতুলের উল্লেখ আছে চর্যাগীতিতে। ইক্ষুর রস জ্বাল দিয়ে গুড় বা চিনি বানানো হতো। আপনাদের পরিচিত ভ্রমণস্থান "গৌড়" নামটি গুড় থেকেই এসেছে বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। যাইহোক ধানের খই, মুড়ি সে যুগেও বেশ ব্যবহৃত বস্তু ছিল। আজকের মত সে যুগের বিবাহ উৎসবেও "লাজহোম"-এ প্রচুর খই বর্ষণ করা হতো।


এত কথার মাঝে ভেবে দেখেছেন আপনার প্রত্যহিক খাদ্য তালিকা থেকে দুটি খুবই পরিচিত খাদ্য বাদ দিয়ে দিয়েছি। বলুনতো কী? মনে পড়েছে। আমি আলু আর ডালের কথাই বলছি।

"খেয়ে বাঙালি আলু, হয়েছে গোলুমোলু।"

অথচ পর্তুগিজরা আসার আগে বাঙালিরা সর্বোপরি ভারতীয়রাও আলুর স্বাদ পায়নিকো। আমরা আলুর ব্যবহার ১৪৯৮এর পরে শিখেছি (পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কালিকট বন্দরে আসেন)। শোনা যায় সদ্য আমদানি বিদেশি সবজি আলু প্রথমদিকে রাজকীয় মর্যাদা পেতে। আজকে যেমন আপনি ছুটির দিনে মাংস কিনে"আদা দিয়ে বেটে, ঘেঁটে চেটে" মজা করে খান। তখন একটু সম্ভ্রান্ত বাঙালি সপ্তাহে একদিন বা বিশেষ দিনে বাজার থেকে আলু কিনে এনে "আলু খেতেন।" ভাবুনতো পাশের বাড়ির বাচ্চাটা এসে আপনাদের বাড়িতে বলছে-- "জানো তো আজ আমরা আলু খাবো, বাবা বাজার থেকে কিনে এনেছে, কত্ত মজা হবে।"


"ধান ভাঙতে শিবের গীত",এবার গাইবো ডালের গীত। সেদিনের বাঙালি কিন্তু ডালের ব্যবহার করত না বললেই চলে। নিম্ন গাঙ্গেয় অঞ্চলের এই বাংলার মাটি ডাল চাষের জন্য খুব একটা উপযুক্ত নয়। তাছাড়া নদ-নদী,খাল-বিল দ্বারা পূর্ণ মৎস্য প্রবণ অঞ্চলে ডালের কী দরকার, মাছের ঝোল যথেষ্ট। স্বাদও বেশি গুণও বেশি। এখনো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ এবং দ্বীপগুলিতে ডালের ব্যবহার অত্যন্ত কম, নেই বললেই চলে। পরিবর্তে স্যুপ বেশ জনপ্রিয়। তবে বাংলার কোন কোন জেলায় বিশেষ করে বরিশাল ও ফরিদপুরে খাওয়ার পর ডাল খাওয়ার রীতি প্রচলিত আছে এখনো।

"যত্তসব বাঙালের দল,

খাওয়ার পর খায় এক বাটি ডাল।"(এই কথা আপনারা সিনেমা,নাটক বা গল্পে অনেক পড়েছেন বা শুনেছেন)।

খাওয়া শেষে পান-সুপারির রেওয়াজ ছিল তবে তা সাজিয়ে না দিয়ে আলাদা আলাদা করে দেওয়া হত।


খাওয়া-দাওয়া তো অনেক হলো। একটু পান করবেন নাকি। সে আপনি না খেতে (পান করতে) চান খাবেন না। তবে আপনার সহজাতি বাঙালিরা কিন্তু আজকাল "ও জিনিস" বেশ খাচ্ছে (পান করছে)। "পানে" আজ আমরা ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে প্রথম দিকেই আছি। গত পুজোতে আমরা প্রায় একশো কোটির "ও জিনিস"খেয়ে ফেলেছি। এ প্রবণতা বাঙালির একালেও আছে, ওই কালেও অল্পবিস্তর ছিল। গম, গুড়, মধু, ইক্ষু, তালরস প্রকৃতিক গাজিয়ে  নানা প্রকারের মদ তৈরি করা হতো। বাঙালি স্মৃতিকার ভবদেব ভট্ট তাঁর "প্রায়শ্চিত্তপ্রকরণ"গ্রন্থে নানাপ্রকার মদ্যপানীয়ের উল্লেখ করেছেন এবং মদ্যপান নিষিদ্ধ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে লোকে তাঁর এই নির্দেশ কতটা মেনে চলত তা বলা কঠিন। "চর্যাপদ" বা "চর্যাগীতিতে" সৌন্ডিকালয় বা শুঁড়িখানার উল্লেখ আছে। সৌন্ডিকালয়ে (আধুনিক বার) বসে সৌন্ডিক বা শুঁড়ির স্ত্রী মদ বিক্রয় করতেন এবং ক্রেতারা (মূলত তৃষ্ণার্তরা) সেখানে বসেই তা পান করতেন।শুঁড়িখানার দরজায় সম্ভবত কিছু একটা চিহ্ন আঁকা থাকতো, মদ্যভিলাষীরা সেই চিহ্ন দেখে গন্তব্য চিনে নিতেন। সাধারণত ঘড়া থেকে বেলের খোলাতে মদ ঢেলে ক্রেতাকে দেওয়া হতো।

"চর্যাগীতির" লেখক বিরূবাপাদ লিখেছেন----


"দশমী দুআরত চিহ্ন দেখিয়া।

আইল গরাহক আপনে বহিয়া।।

চউশটি ঘড়িয়ে দেল পসারা।

পইঠেল গরাহক নাহি নিসারা।।"


(শুঁড়ির ঘরের চিহ্ন আছে দুয়ারেই; সেই চিহ্ন দেখে গ্রাহক নিজেই চলিয়া আছে; চৌষট্টি  ঘড়ায়(এখনকার ৬৪ পেগ) মদ ঢালা হইয়াছে; গ্রাহক যে ঘরে ঢুকিল তাহার আর সাড়াশব্দ কিছুই নাই।(মদের নেশাই এমন বিভোর) )


এই প্রবনতা কিন্তু আজও আছে। দেখবেন, যে পানে ইচ্ছুক অচেনা জায়গা হলেও সে ঠিক পানশালা খুঁজে বের করবে। ধরুন কোনো অচেনা জায়গায় বরযাত্রী গিয়েছেন, সেই জায়গা সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। অথচ ওই তৃষ্ণার্ত মানুষেরা আধাঘন্টার মধ্যেই ঠিক ব্যবস্থা করে তাদের পান শুরু করে দেবে। আমাদের মেসের এক দাদা এই বিষয়ে একটা গল্প বলেছিল। আপনাদের বলছি শুনুন। একবার রাজস্থানে ট্যুরে যাওয়ার সময় একজন মানুষ তার এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেন। ট্রেনে করে মদ নিয়ে যাওয়া কী উচিত হবে? বন্ধুটি বললেন-এই কাজ কখনো করিস না। এটা আইনত অপরাধ। আর রেলে মদ সহ ধরা পরলে কী অবস্থা হবে জানিস তো। তোর ট্যুর গন্তব্যস্থানেই মদ কিনতে পাবি। শোন, দুনিয়াতে খচ্চর মানুষ (খারাপ মানুষ) আর মদের ভাটির অভাব নেই।


পরিশেষে এটাই বলব ধূমপান ও মদ্যপান শরীরের জন্য ক্ষতিকারক।(Cigarette smoking and alcohol consumption is injurious to health).

তাই দূরে থাকাই ভালো। সে যুগেও কেউ কিন্তু মদ্যপান বিষয়ে সাবধান করা হত বারবার।


 "যদি করো অধিক মদ্যপান,

চোখে দেখিবে সর্ষেফুল

সংসার ভেঙে হবে খানখান।"


খানপান অনেক হলো। এবার একটু রেস্ট নিন। পারলে ভাতঘুম দিন। আগামী পর্বে না হয় মধ্যযুগের বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের থালা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব। সবাইকে ধন্যবাদ, ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন।



***বিবাহভোজের সেকাল-একাল নিয়ে খাইবারপাস- এ অভিষেক দার সুন্দর মনোজ্ঞ বিবরণ আছে। সময়মতো অবশ্যই একবার পড়ুন। খেতে (পড়তে) ভালো লাগবে।

2 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন