ভূতুড়ে কালাকাঁদ ও একটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের গল্প।


 আপনারা কেও কোনো দোকানের শেষকৃত্যের কথা শুনেছেন?হয়তো শোনেননি,কিন্তু ২০১৫ সালের জুলাই মাসের ১ তারিখ দিল্লীর চাঁদনী চক এর দোকানদার আর বাসিন্দারা ভেবেছিলেন এরকম ই এক শেষকৃত্যের কথা।তাহলে ঘটনা টা খুলেই বলা যাক।এই প্রতিবেদন,যতটা না খাওয়ার তার থেকেও বেশী একটা দোকানের গল্প, যার শেষকৃত্যের কথা ভাবা হয়েছিল প্রায় ২২৫ বছর ধরে এক ই জায়গায় থেকে ব্যাবসা ধরে রাখার পর।


ভূতুড়ে কালাকাঁদ ও একটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের গল্প।


শুরুটা হয়  ১৭৮০ সালের শেষের দিকে। মির্জা গালিব তখন ও পৃথিবীর আলো দেখেন নি, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল কারো কল্পনাতেই নেই হয়তো, কলকাতা শহর হয়ে ওঠার তোড়জোড় করছে,তার  বছর দুয়েক আগেই মোঘল সম্রাট  দ্বিতীয় শাহ আলম কে গোলাম কাদির অন্ধ করে দিয়েছেন আর মারাঠারা তার পরিত্রাতা হয়ে দেখা দিয়ে চাঁদনী চক এর অদূরে চাওরি বাজার এ বেশ গুছিয়ে বসেছেন।সেই সময়ে একটা ঘণ্টার ধ্বনি শোনা যেত চাঁদনী চক এর রাস্তায় আর সাথে দেখা যেত এক মজবুত শরীরের মধ্য বয়স্ক মানুষকে, যার  মাথায় রাখা ঝকঝকে পেতলের থালায় থরেথরে মিষ্টি সাজানো, সেটা কখনো কালাকাঁদ বা কখনো হালওয়া সোহন।তার হাতে ধরা ঘণ্টা বাজিয়ে তিনি জানান দিতেন তার উপস্থিতি।এই মানুষটির নাম লালা সুখরাম জৈন। এনার ই অধস্তন সাত পুরুষ তার এই ব্যবসা চালিয়ে নিয়ে ২০১৫ সালে সেটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

কিছুদিন হেঁটে হেঁটে বা পরের দিকে ঠেলা গাড়িতে মিষ্টি ফেরি করে ফেরার পর যখন তার মিষ্টির গুনে ওই চত্বরের আমির উমরাহ রা মশগুল হয়ে উঠেছেন,ব্যবসাও বৃদ্ধি পেয়েছে সেই সময় খোদ চাঁদনী চক এ একটা বড়সর দোকান খুলে বসেন এই সুখরাম।ব্যবসাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে ঝড়ের গতিতে।মনে রাখতে হবে মুঘল জামানার রোশনাই কমে গেলেও শাহজাহানবাদ তখন ও ভারতবর্ষের সবচেয়ে ধনী লোকেদের বাসভূমি। পৃথিবীর সব ধরনের জিনিস পাওয়া যায় চাঁদনী চক এ।ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ আর নিজের হাতজশ এই দুইয়ের মিশেলেই কামাল করতে শুরু করেন সুখরাম।তিনি যে ঘণ্টা বাজিয়ে মিষ্টি ফেরি করতেন সেটাই লাগিয়ে দিয়েছিলেন দোকানের সামনে ,সেই থেকে এই ২০১৫ সাল পর্যন্ত এক ই জায়গায় দাড়িয়েছিল ' ঘন্টেওয়ালা "

তিনি যে মিষ্টি  নিয়ে রাজস্থানের আম্বের থেকে জয়পুর এ রাজস্থানের রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার পর দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন সেটা ছিল আমাদের অতিপরিচিত কালাকাঁদ আর সাথে হালওয়া সোহন।


কালাকাঁদ এর আর নতুন করে পরিচয় দেওয়ার দরকার নেই,এই বহুল প্রচলিত সন্দেশ নিয়ে ভারতের উত্তর ও পশ্চিম প্রান্তে এক মজার গল্প প্রচলিত আছে, বরং সেটা একটু শুনে নেওয়া যাক।

অনেকের মতে পিপল গাছের নীচে কালাকাঁদ রেখে দেওয়া হয় যাতে জ্বীন বা প্রেত রা সন্তুষ্ট হয়।আর আম্বের অঞ্চলে এই সুখলাল বাবুর কালাকাঁদ বহুল প্রচলিত একটি মিষ্টি তে পরিণত হয়েছিল,সেখানকার অধিবাসীরা শুধু যে নিজেরাই এর আস্বাদন গ্রহণ করতেন তাই না, জ্বীন বা প্রেতের উদ্দেশ্যেও তা নিবেদিত হতো। আম্বের এ সুখলাল এর ব্যবসা ভালোই চলছিলো কিন্তু বাঁধ সাধলো তখন, যখন রাজধানী জয়পুর এ স্থানাতরিত হতে শুরু করলো। সুখলাল ও ব্যবসা বাণিজ্যের অবনতি লক্ষ্য করে তল্পিতল্পা গুটিয়ে এসে হাজির হলেন দিল্লীর সপ্তম শহর প্রাচীর ঘেরা শজাহানাবাদে। তারপরের গল্প তো আগেই লিখলাম।সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন কালাকাঁদ।আর দিল্লীর বড় মানুষদের মন ভরানোর জন্য নিজের হাতের অসামান্য কারিগরি তে তৈরি করলেন মুলতানের বিখ্যাত ' হালওয়া সোহন '। 


হালওয়া সোহন বা সোহন হালওয়া উত্তর ভারতের মিল্ক কেক।তৈরি করার পেছনে একটা গল্প আছে একদিন এক দুধ বিক্রেতার কিছুটা দুধ নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়,সে তখন ঐ দুধ টাকে ভালো করে ফুটিয়ে তার মধ্যে চিনি ও ময়দা দিয়ে আরো ঘন করে ওপরে ড্রাই ফ্রুট দিয়ে শহরের বড় মানুষদের খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করে,আর খেয়ে সবারই খুব ভালো লেগে যায়।যদিও এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।তবে মনে করা হয় সুখলাল এই হালওয়া সোহন তৈরি করার পদ্ধতি আগে থেকেই জানতেন, দিল্লী তে আসার পর ব্যবসা বেড়ে গেলে তিনিও একের পর এক রকমারি মিষ্টি বানাতে শুরু করেন ,তার সবচেয়ে প্রচলিত মিষ্টি দুটোই ছিল কালাকাঁদ আর হালওয়া সোহন।


এরকম ও গল্প প্রচলিত আছে ;গোলাম কাদের এর হাতে যখন দ্বিতীয় শাহ আলম চরম লাঞ্ছিত হয়েছেন, আমির ওমরাহ দের বাড়ি ঘর লুঠ হয়েছে যথেচ্ছ ভাবে, তার বছর দুয়েকের মধ্যেই সুখলাল এর ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে।অনেকেই আশ্চর্য্য হয়ে যান এই দেখে।গুজব রটতে শুরু করে সুখলাল এর বহু ক্রেতাই নাকি অশরীরী জ্বীন।জ্বীনরা তাদের মানুষ প্রেয়সীর জন্য নাকি ঘন্টেওয়ালার কালাকাঁদ ঝুড়ি ভরে রাতের অন্ধকারে কিনে নিয়ে যায়।এই জ্বীনদের কাণ্ড কারখানার জন্য দিল্লী অবশ্য বেশ বিখ্যাত। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও ভারত প্রেমিক উইলিয়াম ডাররিম্প্লে তার একটা আস্ত বই এর নাম দিয়েছিলেন ' 'City of Djinns' যদিও বইটা ভূতুড়ে কাণ্ড কারখানা নিয়ে লেখা না,একটা শহর কিভাবে এত গুলো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়ে এখনো টিকে আছে তাই এই বই এর বিষয়বস্তু।


ঘনটেওয়ালা নিয়ে আরো কিছু মজার কাহিনী শোনা যায়,যেমন সম্রাটের হাতি নাকি এসে ঘণ্টা বাজিয়ে সম্রাটের জন্য মিষ্টি নিয়ে লাল কেল্লায় ফিরে যেত।আসলে এত বছরের পুরনো একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিয়ে গল্প গড়ে ওঠাই স্বাভাবিক। নস্টালজিয়া শুধু বাঙালিদের ই ভোগায় না, দিল্লীর মত আপাত কাঠখোটটা শহর ও এর দ্বারা আক্রান্ত।


এই দোকান বহু কিছুর সাক্ষী থেকে গেছে ২২৫ বছর ধরে, মুঘোল জামানার পতন, সিপাহী বিদ্রোহ, লালকেল্লায় প্রথম স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন সব কিছুর ই নির্বাক সাক্ষী লালকেলার উল্টো দিকের এই মিষ্টির দোকান । আমাদের পূর্বোক্ত ঐতিহাসিক উইলিয়াম সাহেব তার আর একটা দারুন বই ' The last Mughol ' বইতে সিপাহী বিদ্রোহের অধ্যায় লিখতে গিয়ে লিখছেন 


The moment they have a round of Chandni Chowk ... enjoy the sweetmeats of Ghantawala, they lose all urge to fight and kill the enemy.


অর্থাৎ ঘন্টেওয়ালার মিষ্টি খেয়ে যুধৌন্মদ সৈনিক রাও নরম হয়ে পরেছিল এর স্বাদ এ মোহিত হয়ে।


স্বাধীনতার পর ও ভারতের পূর্বতন প্রধানমন্ত্রীরাও ঘন্টেওয়ালার মিষ্টির যথেষ্ট অনুরাগী ছিলেন ।জহর লাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী রাজিব গান্ধী প্রত্যেকেই এর আস্বাদ গ্রহণ করেছেন ও প্রিয় জন দের জন্য পাঠিয়েছেন বারবার।প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বিয়ের মিষ্টি ও সুখলাল এর উত্তরসূরি দের হাতেই তৈরি।

ভূতুড়ে কালাকাঁদ ও একটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের গল্প।


বলিউড ও এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান টিকে তুলে ধরেছে তার সিনেমার মধ্যে দিয়ে।১৯৫৪ সালে B.R. Chopra নির্মিত ' চাঁদনী চক ' সিনেমায় বাস্তবের চিত্র তুলে ধরতে চাঁদনি চক এর আদলে মুম্বাই এ  তৈরি হয়েছিল  আস্ত একটা সিনেমার সেট,সেখানে চাঁদনি চক বোঝাতে ঘন্টেওয়ালার দোকানের আদলে নির্মিত হয় একটি দোকান।


এরকম অজস্র ঘটনার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দোকানটি ২০১৫ সালে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় সুখলাল এর উত্তরসূরিরা। তৎকালীন মালিক সুশান্ত জৈন পত্রিকা গুলো কে জানিয়ে ছিলেন তাদের পক্ষে বর্তমান সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিভিন্ন আইনি জটিলতা কাটিয়ে উঠে প্রতিষ্ঠান টি টিকিয়ে রাখা আর সম্ভব না।


আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের দেশে কোনো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণের ব্যবস্থা বড়ই দুর্বল। সরকারি সাহায্য যা পাওয়া উচিত তাও পাওয়া হয়ে ওঠেনা সব সময়।এই ভাবেই একে একে হারিয়ে যায় শতাব্দী প্রাচীন একের পর এক নিদর্শন।

ভূতুড়ে কালাকাঁদ ও একটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের গল্প।


4 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন