জয়নগরের মোয়ার ইতিহাস। লেখায়-অভ্রনীল রায়

শীতকাল মানে একেকজন মানুষের কাছে একেক রকমের নস্টালজিয়া।কারো কাছে খেজুরের গুড়ের রসগোল্লা তো কারো কাছে ভিন্ন রকমের টাটকা শাক- সব্জি।এমনিতেই শীতকাল হ'লো খাদ্যরসিকদের কাছে প্রিয় একটা মাস।পাত পেড়ে খাওয়ার জন্য সেরা সময়।বাইরে ঘন কুয়াশা,হাল্কা শিরশিরে হাওয়া,সংগে দেদার খাওয়া দাওয়া-আর কী চাই।তবে আজ আপনাদের 'খাইবারপাসে' শীতকালেরই এক মিষ্টি খাইয়ে মিষ্টি মুখ করাবো।এবছরে আপনাদের খাওয়ানো প্রথম মিষ্টি, তাই একটু অন্য রকম আর বিশেষ না হলে চলে!!! নভেম্বর থেকেই শীতের আমেজ আসার সঙ্গী করেই বাঙালির রসনার তৃপ্তি ঘটাতে উপস্থিত হয় আজকের এই বিশেষ মিষ্টির,যা শীতকালকে করে তোলে মিষ্টি মধুর।আপনারা কি একটু হলেও ধরতে পারছেন আমরা কোন মিষ্টির কথা বলছি? ঠিক আছে আর দেরী না করে সরাসরি মিষ্টি মুখেই ঢুকি আর আপনাদের উপহার দিই এক অসাধারণ মিষ্টির স্বাদের।

জয়নগরের মোয়ার ইতিহাস।



আজ যে মিষ্টির গল্প নিয়ে হাজির হয়েছি তা হল মোয়া, তবে এবার যদি ভৌগোলিক অবস্হান উল্লেখ করে বলি তাহলে আপনাদের কাছে বিষয়টা হবে আরো স্পষ্ট-জয়নগরের মোয়া।এবার বোঝা গেলো?চিরাচরিত 'মোয়া' থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক বিশেষ ধরনের মিষ্টি যা দক্ষিন চব্বিশ পরগোনা জেলার 'জয়নগর' এবং 'বহুরু' নামক জায়গা থেকেই তৈরি হয় এবং আমরা সকলেই কম বেশী খেয়েছি তা হ'ল এই 'জয়নগরের মোয়া'।


'জয়নগরের মোয়া' তৈরির প্রধান উপকরন হ'ল এক বিশেষ ধরনের ধান।তার নাম কনকচূড়,সাথে ভালোমানের নলেন গুড়,কাজু বাদাম,পেস্তা,কিসমিস, ক্ষীর।এই কনকচূড় ধান থেকে খই তৈরি করে তা থেকেই এই মোয়া তৈরি হয়।মূলত বলা যেতেই পারে এই মিষ্টির প্রধান উপকরন হল 'কনকচূড়' ধান। জয়নগর,বহুরু এর পাশাপাশি দক্ষিন চব্বিশপরগোনার কুলপি,কাকদ্বীপ, নামখানা এলাকার প্রায় ৫০০ একর জমি জুড়েই শুধু কনকচূড় ধানের চাষ হয়।এছাড়া অন্যান্য জেলায় এই ধানের চাষ হয় না বলেই দক্ষিনচব্বিশ পরগনাই জয়নগরের মোয়ার তৈরির ইতিহাসের পেছনে অন্যতম কারন।এছাড়া এই মোয়া তৈরির আরেকটি উপাদান 'খেজুরের গুড়'।যা জয়নগরের কাছাকাছি দক্ষিনচব্বিশ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুর,গোচরন,

দক্ষিন বারাসত,মথুরাপুর প্রভৃতি এলাকার খেজুর গাছ থেকে দক্ষ শিউলি দ্বারা সংগ্রহ করা হয় এবং কড়াইতে জ্বাল দিয়ে ঘন করে খেজুর রস তৈরি হয়।কনকচূড় ধানের পাশাপাশি খেজুরের রসের আধিক্যই এই এলাকায় 'জয়নগরের মোয়া' তৈরির আদর্শ স্হান বলে বিবেচিত হয়।


তবে কী করে এই ধান থেকেই খই তৈরি করা হল,আর জয়নগরেই তৈরি হল এই বিশেষ মোয়ার তার পেছনের ইতিহাসটা ঠিক কি একটু জানবো না? যেখানে 'খাইবারপাস' ইতিহাসের খাবার আর খাবারের ইতিহাস নিয়ে গল্প বলে সেখানে এটা আরোই জানতে হবে।চলুন তবে শুনে নিন এর ইতিহাস।


ইতিহাস বলে,জয়নগর বাজার থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের একটি ছোট্ট প্রাচীন বর্ধিঞ্চু গ্রাম বহুরু।সেখানকার এক অধিবাসী ছিল যামীনী বুড়ো যিনি একদিন তাঁর বাড়ির এক অনুষ্ঠানে তাঁর জমিতেই তৈরি কনকচূড় ধান থেকে খই তৈরি করে বাড়িতে থাকা খেজুরের রস দিয়ে নরম করে তৈরি করে এক মোয়া।সেই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন স্বয়ং শ্রীচৈতন্যদেব।তাঁর এই মোয়া খেতে দারুন লাগে,এবং অন্যান্য আমন্ত্রিতরাও মুগ্ধ হয়ে ওঠে।তারপরই 'যামীনী বুড়োর' নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।পরবর্তীতে ১৯২৯ সালে সেই গ্রামেরই বাসিন্দা পূর্ণচন্দ্র ঘোষ বা বুঁচকি বাবু এবং নিত্যগোপাল সরকার ব্যবসায়িক লাভের আশায় জয়নগর বাজারে প্রথম এই মোয়া তৈরির কারখানা স্হাপন করেন।তারপর থেকেই তো এই অতি অসাধারণ স্বাদের মোয়া- মিষ্টি যেন নিজেই একটা ইতিহাস।


তবে অনেকের মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে এই মোয়ার তৈরি 'বহুরু' গ্রামে হলেও এর নামের সাথে 'জয়নগর' কেনো? হতেই তো পারতো 'বহুরুর মোয়া'।আসুন তার পেছনের ব্যাখাটাও আপনাদের একটু দিয়ে রাখি বরং। বহুরু গ্রামের যামীনী বাবুর হাতেই তৈরি এর ইতিহাস, তা তো আমরা জানলামই।কিন্তু বহুরু ছোট গ্রাম হওয়ায় গ্রামের হাট বসতো এর থেকে কিছুটা দূরের জয়নগরে।এই গ্রামের কাছে সবচেয়ে বড় বাজার জয়নগরেই।পরবর্তীতে বহুরুর এই মোয়া বিক্রির জন্য যেত জয়নগর হাটে।লোকজন সকলে কিনতো জয়নগর থেকেই।একটার পর একটা মিষ্টির দোকান খুলতে লাগলো জয়নগরে এই মোয়াকে কেন্দ্র করেই।লোকজনও মোয়া জয়নগর থেকেই কিনে যেতে লাগলো তাই লোকমুখে কনকচূড় ধানের এই মোয়াই হয়ে গেলো 'জয়নগরের মোয়া' আর তারপর তো ইতিহাস।আর এই ইতিহাস কে সঙ্গী করেই ২০১৫ সালের ২৩ শে মার্চ ভারত সরকার থেকে 'জয়নগরের মোয়া' কে জিআই ট্যাগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যা খাদ্য প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত সম্মানের।


তবে একথা ভুললে চলবে না, এই বিশেষ মোয়ার আদিঘর কিন্তু শান্ত শীতল দীঘি ঘেরা গ্রাম বহুরুই।আজও সবচেয়ে বেশী পরিমানে মোয়া এই গ্রামেই তৈরি হয়।জয়নগরেও কিছু কিছু দোকান নিজেরা তৈরি করলেও বেশীরভাগ মিষ্টির দোকান গুলো বহুরু থেকে মোয়া এনেই জয়নগর থেকে বিক্রি করে।তাই জয়নগরের সাথে বহুরু নামটাও থাকুক এই মোয়ার সাথে,এরকম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জয়নগর ও বহুরের মিষ্টির প্রাচীন দোকানগুলো যারা মোয়া বিক্রির জন্য বিখ্যাত যেমন 'শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভান্ডার, বীণাপানি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার' এরা কিন্তু বর্তমানে তাদের মিষ্টির প্যাকেটে বহরুর মোয়া নামই লিখছে।

জয়নগরের মোয়ার ইতিহাস।


'গোলাপ কে যে নামে ডাকো,সে তো গন্ধ ছড়াবেই'- তাই আমাদের কাছে 'জয়নগর' হোক বা 'বহুরু' স্বাদে গন্ধে আসল হলে আমাদের কে পায়।টপাটপ মুখে ঢোকাবো আর আস্বাদিত হব এর স্বাদে।তবে হ্যাঁ,অথেন্টিক 'জয়নগরের মোয়া' পেতে হলে আপনাকে জয়নগর বা বহুরুর নামকরা মিষ্টির দোকান গুলোতেই আসতে হবে।কারন ইদানিং কলকাতার বহু বাজারে বা উত্তরবঙ্গেও 'জয়নগরের মোয়া' বলে ডুপ্লিকেট মোয়া বিক্রি করা হয়,যা আদৌ কনকচূড় ধানের খই দিয়ে তৈরি না।তাই এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি।ভালোমানের মোয়া খাওয়ার জন্য একবার চলেই আসুন জয়নগরে,আর এখান থেকে কেজি প্রতি ৫০০, ৪২০, ৩২০ এরকম রেটে তিন রকমের উৎকৃষ্ট মানের স্বাদে গন্ধে অমলিন মোয়া পেয়ে যাবেন।যার প্রতি কামরে কাজু,কিসমিস,ক্ষীরের সাথে খেজুরের গুড়ের মিঠে গন্ধ জানান দেবে শীতের অনাবিল আমেজের।


4 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন