খাওয়ার নিয়ে লাফরা করা নৈব্য নৈব্য চঃ। লিখেছেন অভ্রনীল রায়

 উৎসব মুখর বাঙালির কাছে পূজা পার্বনের গুরুত্ব অপরিসীম।দুর্গা,কালি,সরস্বতী,লক্ষ্মী থেকে শুরু করে সত্য নারায়ন পূজা সে যাই হোক না কেনো আনন্দ হুল্লোড় করতে তো আর বাঁধা নেই।তাই কি না? তবে আমরা তো 'খাইবার পাস',বলি খাবারের গল্প, তো আজ হঠাৎ এত ধর্মপরায়ণ হয়ে গেলাম কেনো ভাবছেন তো?

খাওয়ার নিয়ে লাফরা করা!নৈব্য নৈব্য চঃ - লিখেছেন অভ্রনীল রায়

আরে বাবা,পূজার কথা বললাম মানে পূজার ভোগ-প্রসাদের কথা আসবে না তাই হয়!! এই তো লাইনে চলে এসেছি। আচ্ছা আপনারা বুকে হাত রেখে বলুন তো,পূজা শেষে যদি পাতে পরে খিচুড়ি আর তার সাথে সব রকম মরশুমি সব্জি সহকারে তৈরি গরম গরম 'লাফরা' তাহলে তো আর কথাই নেই।আহা,বলতেই যেনো চারিদিকে একটা মনোমুগ্ধকর গন্ধে ভরে উঠল!!


হ্যাঁ,আজ আপনাদের সাথে পরিচয় করাতে এসেছি যাকে নিয়ে তিনি হলেন স্বয়ং পাঁচমেশালি তরকারি লাফরা।ইনি এমন এক সব্জি যার মধ্যে আলু,পটল,বেগুন,মূলা,মিষ্টি কূমড়ো,পটল হাতের কাছে যা যা পাওয়া যায় সব কিছুই নিশ্চিত ভাবে দিয়ে দেওয়া যায়,আর সামান্য ঘি-গরমশলা ফড়নে ইহাই হয়ে ওঠে এক লোভনীয় এবং বহু কিছুর পুষ্টিগুনে সমৃদ্ধ এক অতি উত্তম উপাদেয়।


কিন্তু আপনারা হয়তো ভাবছেন, আমি যে সব্জির কথা বললাম তা তো আপনাদের কারো কাছে 'ঘাটি তরকারি', বা কারো কাছে 'লাবরা', আবার হাল আমলের রেস্তোরাঁ হোটেলের সৌজন্যে 'মিক্স ভেজ', তাহলে লেখক অযথা 'লাফরা' করতে এসেছে কেনো!!না না ভয় পাবেন না,এবার সোজাসুজি বরং 'রান্না'টা চাপিয়েই দিই।


আমাদের পরিচিত এই খাবারটি একেক জনের কাছে একেক নামে পরিচিত।তবে এই সবকিছু মিশিয়ে তৈরি করা সব্জিটির আসল নাম 'লাফরা'।লাফরা একটি তৎসম শব্দ এবং পরবর্তীতে  অপভ্রংশ  হয়ে শব্দটি অলাবু থেকে লাবু হয়ে এর সাথে ড়া যুক্ত হয়ে লাবড়া হয়েছে।মনে করা হয়,এতে সব রকমের সব্জি দিলেও এর প্রধান উপকরণ লাফা বেগুন (বাংলাদেশের গফরঁগাও জেলার এক বিখ্যাত গোলাকৃতির বেগুন,যা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে) ছিল বলে এই ব্যঞ্জনের নাম হয়েছিল  লাফরা,। সেটাই পরে মানুষের কথ্য ভাষার চলে অন্য নামে পরিচিত হয়েছে বহু জায়গায়।


আপনি হয়তো জানলে অবাক হবেন এই আপাত নিরিহ সব্জীর বর্ণনা স্বয়ং চৈতন্য চরিত্রামৃত এবং চৈতন্য ভাগবত গ্রন্হে প্রথম উল্লেখ করা হয়,কারন চৈতন্য দেবের ছিল এটা অতি প্রিয় খাদ্য। কী ভাবছেন,আমি হয়তো ব্যাপারটাকে মাখো মাখো করতে এমনি একটা ইতিহাস এর উত্স বলে দিলাম। যদি আপনি কখনো এই গ্রন্হদুটি পড়ে থাকেন বা আপনাদের বাড়িতে থাকে তাহলে একটু খুলে দেখুন। 


  'চৈতন্যচরিতামৃত' এর  মধ্যলীলার ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে লেখা আছে দুটো শ্লোকঃ


'সার্ব্বভৌম পরিবেশন করেন আপনে।

প্রভু কহে মোরে দেহ লাফরা ব্যঞ্জনে।। '


অর্থাৎ সকলেমিলে যখন চৈতন্যদেবকে খাবার পরিবেশন করছিলেন তখন চৈতন্যদেব তাদের উদ্দেশ্য লাবড়া দেওয়ার কথা বলেন।


আবার,চৈতন্যচরিতামৃত এর মধ্যলীলার দ্বাদশ পরিচ্ছেদে লাফরার সম্বন্ধে বর্ণনা পাওয়া যায়ঃ


'প্রভু কহে মোরে দেহ লাফরা ব্যঞ্জনে।

পিঠা, পানা, অমৃতগুটিকা দেহ ভক্তগণে'


তাহলে বুঝুন, স্বয়ং বৈষ্ণব সাহিত্যে ব্যবহৃত জিনিস যা কিনা আমরা হামেশাই খাই অথচ কতটাই হেলেফেলে ভাবতাম!


মূলত এটি পূর্ববঙ্গে বসাবাসকারী বাঙালিদের কাছে একটি পরিচিত ব্যঞ্জন ছিল।চৈতন্য দেবেরও যে প্রিয় ছিল তা তো জানলামই।সেই জন্য নবদ্বীপের ঠাকুরবাড়ি গুলোতে এখনো লুচি বা খিচুড়ি যাই হোক তার সাথে লাফরা থাকবেই প্রধান ভোগ হিসেবে। 


আবার একটা সময় অবধি বিয়ে বাড়িতে লাফরা দেওয়া হত মেনু তে। তবে সত্তরের দশক থেকে বিয়ে বা ভোজ বাড়তে এই পদের অবুলপ্তি ঘটলেও, বর্তমান সময়ে খাবারের নবজাগরণ হিসেবে ক্যাটারিং এর চল আসায়,এই পদটিই তাঁর জাত বদলে কোথাও পনির ও নয়টি সব্জি সহযোগে নবরত্ন, কোথাও মাছের কাটা দিয়ে ছ্যাছড়া আবার কোথাও বা মিক্স ভেজ নামে পাতে পাতে দিব্যি খেলে যাচ্ছে। আরেকটা ছোট্ট তথ্য দিয়ে রাখি যদি এরপর থেকে কখনো লাফরা বাড়িতে তৈরি করেন তাহলে অবশ্যই করবেন পিতলের কড়াইতে, কারন লোহার কড়াইতে করলে বহু সব্জির সমন্বয়ে এর রংটা ঠিক আসে না যা পিতলে বেশী ভালো হয়।


তাহলে পাঠকবন্ধুরা,অনেক কিছু তো জেনেই ফেললেন,তাহলে আর দেরী কিসের,চটপট বাড়িতে বানিয়ে ফেলুন খিচুড়ি আর তার সাথে কোনো রকম 'লাফরা'য় না জড়িয়ে কব্জি ডুবিয়ে খান অতি সুস্বাদু পাঁচমেশালি এই সব্জি।

20 মন্তব্যসমূহ

  1. আহ্ ,,,,
    তোমার লেখা আর লাবরা র স্বাদ দুই ভীষন প্রীয় আমার ,❤️

    উত্তরমুছুন
  2. লাফরা মানে বুঝতাম ঝামেলা করা, লাফরা যে একটা খাওয়ার এরও নাম হয় সেটা প্রথমবার জানলাম. পড়ে ভালো লাগলো ❤️

    উত্তরমুছুন
  3. কাকতলীয় ব্যাপার।আজ খিচুরি র সঙ্গে লাফরাই খেলাম

    উত্তরমুছুন
  4. বাড়ির লক্ষ্মী পুজোয় ভোগ দেয়া হয় লাবড়া,including ডালের বড়ি!!!

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন